আন্তর্জাতিক ডেস্ক :
ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযানের ব্যাপকতা বাড়ছেই। সামরিক সক্ষমতার দিক দিয়ে অনেক পিছিয়ে ইউক্রেন। অন্যদিকে বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি হয়েও ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণ নিতে রুশ সেনাদের কেন বেগ পেতে হচ্ছে নিয়ে চলছে হিসেব নিকেশ।
গণমাধ্যম বলছে, টানা যুদ্ধে প্রত্যাশার চেয়েও সফল ইউক্রেন বাহিনী। কোন কৌশলে এগচ্ছে ইউক্রেনের সেনারা? কেনই-বা রুশ সেনারা তাদের সহজে পরাস্ত করতে পারছে না?
মুহুর্মুহু ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হচ্ছে ইউক্রেনীয় সেনাদের ওপর। হচ্ছে গোলা বর্ষণ। তবে এসব হামলাকে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে প্রতিহত করে দিচ্ছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদমির জেলেনস্কির বাহিনী। কি সেই রহস্য?
ইউক্রেনের প্রতিরোধ যুদ্ধকে অনেকটাই সহজ করে দিয়েছে ট্যাংকবিধ্বংসী মিসাইল জ্যাভলিন। দেখতে রকেট লঞ্চারের মতো হলেও মূলত শত্রুপক্ষের নিক্ষেপ করা ক্ষেপণাস্ত্রকে প্রতিহত করাই জ্যাভলিনের কাজ।
রুশ সামরিক অভিযানে ইউক্রেনের প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে উঠেছে জ্যাভলিন। যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি জ্যাভলিন অ্যান্টিট্যাঙ্ক মিসাইলটি ইউক্রেনের বাহিনীর মন জয় করে নিয়েছে। ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে সামাজিক মাধ্যমেও। ভালোবেসে তারা নাম দিয়েছেন সেন্ট জ্যাভলিন। প্রতিরোধ যুদ্ধে আশাতীত সাফল্য পাওয়ায় সব কৃতিত্বই এখন এই জ্যাভলিনের।
জ্যাভলিনের জনপ্রিয়তা পাওয়ার অন্যতম একটি কারণ খুব সহজেই এটি ব্যবহার করা যায়। ওজন কম হওয়ায় যে কোনো স্থানে সহজেই বহন করা সম্ভব। ৫০ পাউন্ড ওজনের এই অ্যান্টিট্যাঙ্ক মিসাইলটি ছুড়তে কোনো লঞ্চারেরও প্রয়োজন পড়ে না। নির্ভুলভাবে সহজেই আঘাত হানতে সক্ষম সেন্ট জ্যাভলিন।
প্রয়োজনে জ্যাভলিন দিয়ে সরাসরি ফ্লাইট পথ মোডেও নিক্ষেপ করা যায়। যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্ররা যুদ্ধে সরাসরি অংশ না নিলেও সামরিক সহযোগিতার অংশ হিসেবে ইউক্রেনকে বিপুল সংখ্যক এই অ্যান্টিট্যাঙ্ক মিসাইল দিয়েছে তারা।
যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ করা অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে এখন পর্যন্ত শত শত রাশিয়ান ট্যাঙ্ক এবং সাঁজোয়া যানকে ধ্বংস করে দিয়েছে ইউক্রেনের সেনারা। রাশিয়ার বানানো অত্যাধুনিক সাঁজোয়া যানটি সেভেন্টি টু ট্যাঙ্কার আদৌ জ্যাভলিনের বিপরীতে কোনো কাজেই আসছে না। বেশ কিছু অঞ্চল থেকে জ্যাভলিনের প্রতিরোধের মুখে পড়ে পিছু হটতে হয়েছে রুশ সেনাদের।
কীভাবে কাজ করে এই জ্যাভলিন?
জ্যাভলিন ক্ষেপণাস্ত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল সরাসরি গতিপথেই আক্রমণ করতে পারে। প্রথমে মিসাইল টিউব থেকে উৎক্ষেপণের পরেই জ্যাভলিনের প্রাথমিক ফ্লাইট মোটরটি চালু হয়। তারপর এটিকে উঁচুতে ধরার পর সোজাপথে না গিয়ে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুর সম্মুখভাগে আঘাত হানে।
ট্যাঙ্ক এবং অন্যান্য সাঁজোয়া যানের বিরুদ্ধে এটি বিশেষ সুবিধাজনক। কারণ সাঁজোয়াযানের ওপর যে অস্ত্র বা বর্ম থাকে তা সাধারণত পাতলা বা সহজেই তাতে ভেদ করা সম্ভব। বর্শার মতোই উপর থেকে ছুটে এসে মাটিতে আঘাত করে এটি। কাঁধের উপর রেখে একটু উঁচু করে তাক করতে হয়। সোজাসুজি রেখেও জ্যাভলিন থেকে আঘাত হানা সম্ভব।
জ্যাভলিনের উচ্চ-বিস্ফোরকযুক্ত অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক ওয়ারহেডটি বর্তমানে বিশ্বের প্রায় সব ধরনের সাঁজোয়াজানকে প্রতিরোধ করতে সক্ষম। এই জ্যাভলিনে ব্যবহারকারীদের জন্য একাধিক ভিজ্যুয়াল সুবিধা রয়েছে।
অর্থাৎ এর সাহায্যে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু, আগুন শনাক্ত করা সম্ভব। শুধু তাই নয়; ব্যবহারকারীর কোনো রকম হস্তক্ষেপ ছাড়াই চলন্ত লক্ষ্যবস্তুকে নিজে থেকেও ট্র্যাক করতে পারে থাকে এই জ্যাভলিন।
জ্যাভলিনের এই স্বয়ংক্রিয় কার্যক্ষমতার কারণে যে কেউ সহজেই এটি ব্যবহার করতে পারে। অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়ার পর আরেকটি মিসাইল ছোড়ারও যথেষ্ট সময় পাওয়া যায়। একইসঙ্গে ওই সময়ের মধ্যে নিরাপদ স্থানেও অবস্থান নেওয়া সম্ভব। উচ্চ নিরাপত্তাযুক্ত ট্যাংকের পাশাপাশি তুলনামূলক কম উচ্চতায় চলাচল করা হেলিকপ্টার ও বিমানকেও ধ্বংস করতে পারে জ্যাভলিন।
কারা বানিয়েছে এই জ্যাভলিন?
বর্তমানে অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক ক্ষেপণাস্ত্রটি জ্যাভলিন নামে পরিচিত হলেও শুরুতে এর নাম ছিলো হিট। সাড়ে তিন ফুটের ক্ষেপণাস্ত্রটি ১৯৯৬ সালে প্রথম মার্কিন সশস্ত্র বাহিনীতে সংযুক্ত করা হয়। এটি যৌথভাবে রায়থিয়ন ও লকহিড মার্টিন জ্যাভলিন বানান।
তবে এই জ্যাভলিন বানানোর কাজ শুরু হয় ১৯৭৫ সালে। ১৯৮০র দশকে মার্কিন সেনাবাহিনী তাদের অ্যাডভান্সড অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক উইপন সিস্টেম- মিডিয়াম চালু করে। জ্যাভলিনের অফিসিয়াল নাম FGM-148 জ্যাভলিন AAWS M)। সুবিধাজনক ব্যবহারের জন্যকে এটিকে ফায়ার এন্ড ফোরগেট অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক মিসাইলও বলা হয়।
ইউক্রেনে জ্যাভলিনের আগমন!
২০১৮ সালে প্রথম ইউক্রেনকে জ্যাভলিন ক্ষেপণআস্ত্র সরবরাহ করে আমেরিকা। ইউক্রেনীয় সেনাকে তা ব্যবহারের প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন গত ২৫ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনকে অতিরিক্ত ৩৫০ মিলিয়ন ডলারের অস্ত্র দেওয়ার নির্দেশ দেন৷ এর মধ্যে স্টিঙ্গারের পাশাপাশি জ্যাভলিনও রয়েছে।
বিশ্বের অন্যতম সেরা এই ট্যাংক বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে গত কয়েক দিনে রাশিয়ার অসংখ্য ট্যাংক ধ্বংস হয়েছে। রাজধানী কিয়েভের অদূরে পৌঁছে রুশ বাহিনীর পিছু হঠার অন্যতম কারণ এই জ্যাভলিন বলে মনে করছেন সামরিক বিশেষজ্ঞরা।
দাম কেমন এই জ্যাভলিনের?
সুবিধা কার্যকারিতা বিবেচনায় অন্যান্য রণসরঞ্জামের তুলনায় অনেক ব্যয়বহুল এই জ্যাভলিন। এর খরচ পড়ে প্রায় ৮০ হাজার ডলার।
