হোম আন্তর্জাতিক কয়েক দিনের মধ্যেই জ্বালানি সংকটের মুখে পড়তে চলেছে ইউরোপ

কয়েক দিনের মধ্যেই জ্বালানি সংকটের মুখে পড়তে চলেছে ইউরোপ

কর্তৃক Editor
০ মন্তব্য 54 ভিউজ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাব এখন সরাসরি ইউরোপের জ্বালানি নিরাপত্তায় আঘাত হানতে চলেছে। জ্বালানি জায়ান্ট শেলের প্রধান নির্বাহী ওয়ায়েল সাওয়ানের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, খুব শিগগিরই ইউরোপ জ্বালানি সংকটে পড়তে পারে।

তার মতে, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে যাচ্ছে যে খুব শিগগিরই ইউরোপে জ্বালানি সংকট দেখা দিতে পারে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইউরোপের দেশগুলোকে আবারও কঠোর ব্যয় সংকোচনের পথে হাঁটতে হতে পারে। খবর দ্য টেলিগ্রাফ

শেলের প্রধান নির্বাহী ওয়ায়েল সাওয়ান বলেন, বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস সরবরাহে চাপ ইতোমধ্যে এশিয়ার কিছু দেশে জ্বালানি ব্যবহার কমাতে বাধ্য করেছে। এই প্রভাব ধীরে ধীরে পশ্চিমে ছড়িয়ে পড়ছে এবং কয়েক দিনের মধ্যেই ইউরোপেও তা আঘাত হানতে পারে। সাওয়ান সতর্ক করে বলেন, পরিস্থিতি সামাল দিতে ইউরোপের দেশগুলোকে জ্বালানি ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আনতে হতে পারে। সর্বশেষ ২০২২ সালের জ্বালানি সংকটের সময় এমনটা দেখা গিয়েছিল।

বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এখন উপসাগরীয় অঞ্চলে আটকে রয়েছে। কারণ ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে। সামরিক সূত্র জানিয়েছে, এই গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য পথ পুনরায় চালু করতে ব্রিটেন নেতৃত্ব দিচ্ছে। এ জন্য বেসামরিক ‘মাদারশিপ’ থেকে মাইন শনাক্তকারী ড্রোন মোতায়েনের পরিকল্পনাও বিবেচনায় রয়েছে। এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের উপকূলবর্তী গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপগুলোতে সম্ভাব্য স্থল অভিযানের জন্য প্যারাট্রুপার পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে একই সঙ্গে তিনি দাবি করেছেন, তেহরানের সঙ্গে শান্তি আলোচনা চলছে।

দ্য টেলিগ্রাফ জানিয়েছে, ইরান ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক দূতদের সঙ্গে কথা বলতে রাজি নয়। ফলে প্রথমবারের মতো মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সকে আলোচক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। উপসাগরীয় সূত্রগুলো বলছে, ইরান স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে বৈঠক করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তাদের অভিযোগ, যুদ্ধ শুরুর আগে পারমাণবিক আলোচনায় তারা ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ করেছিল।

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সংঘাত এখন চতুর্থ সপ্তাহে পড়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) দেশগুলোকে তেল ও গ্যাসের ব্যবহার কমানোর আহ্বান জানিয়েছে। এর মধ্যে বাড়ি থেকে কাজ অর্থাৎ ওয়ার্ক ফ্রম হোম বাড়ানো, সড়কে গতি সীমা কমানো এবং গণপরিবহন বেশি ব্যবহার করার মতো বিষয়ও রয়েছে।

এশিয়ার দেশগুলো ইতোমধ্যে নানা ব্যয় সংকোচনমূলক পদক্ষেপ নিয়েছে। কোথাও চার দিনের কর্মসপ্তাহ চালু হয়েছে, কোথাও এয়ার কন্ডিশনিং কম ব্যবহারের আহ্বান জানানো হয়েছে, আবার কোথাও সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফর স্থগিত করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের হিউস্টনে এক সম্মেলনে সাওয়ান বলেন, ইউরোপকেও শিগগিরই একই ধরনের পদক্ষেপ নিতে হতে পারে। তিনি বলেন, ‘এটি এক ধরনের তরঙ্গ প্রভাব। প্রথমে দক্ষিণ এশিয়ায় আঘাত করে, তারপর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, উত্তর-পূর্ব এশিয়া হয়ে এপ্রিল নাগাদ ইউরোপে পৌঁছাবে।’

তিনি আরও বলেন, ইউরোপের সরকারগুলোকে চাহিদা নিয়ন্ত্রণ, মজুত বাড়ানো এবং সরবরাহ নিশ্চিত করার বিষয়ে এখনই প্রস্তুতি নিতে হবে। অন্যদিকে ব্যাংকাররা সতর্ক করেছেন, ইরান যুদ্ধের জেরে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে ব্রিটেন মন্দার মুখে পড়তে পারে। আর আরএসি ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, জ্বালানির দাম বাড়ায় চালকদের অতিরিক্ত শত শত মিলিয়ন পাউন্ড খরচ করতে হচ্ছে।

ব্রিটিশ সরকার জানিয়েছে, তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং দেশটির জ্বালানি সরবরাহ বৈচিত্র্যময় ও স্থিতিশীল। তবে জ্বালানি খাতের কিছু সূত্র বলছে, প্রকৃত জ্বালানি সংকট ‘চরম পরিস্থিতি’ সৃষ্টি করবে যদি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান সংঘাত গ্রীষ্মকাল পর্যন্ত গড়ায়।

এদিকে এই সংঘাতের কারণে বাজারে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। গত চার সপ্তাহে তেল ও গ্যাসের দাম যথাক্রমে ৪০ ও ৬০ শতাংশ বেড়েছে। ইরান হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী জাহাজে হামলার হুমকি দেয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। ফলে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও এলএনজি সরবরাহ কার্যত আটকে গেছে।

এমন অবস্থায় এশিয়ার দেশগুলো বিকল্প জ্বালানির খোঁজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। এতে চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো এখন ইউরোপের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি সরবরাহের জন্য প্রতিযোগিতায় নেমেছে।

প্যানমিউর লিবারামের বিশ্লেষক অ্যাশলি কেলটি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের অনেক জ্বালানি কার্গো এখন এশিয়ায় চলে যাচ্ছে, কারণ তারা বেশি দাম দিচ্ছে।’ যুক্তরাজ্যের জ্বালানি খাতের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, শেলের প্রধান যে পরিস্থিতির কথা বলেছেন, তা ‘সবচেয়ে খারাপ সম্ভাব্য চিত্রগুলোর একটি, তবে একেবারে অসম্ভব নয়’। তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে মানুষ সরবরাহের চেয়ে দাম নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন। আগের সংকটেও আমরা সরবরাহ বজায় রাখতে পেরেছিলাম।’

তবে তিনি সতর্ক করেন, এমন একটি সময় আসতে পারে, সেটি সম্ভবত জুন বা জুলাই মাসে, যখন দাম এত বেশি হয়ে যাবে যে ইউরোপ আদৌ তা বহন করতে পারবে কি না, সেটাই প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াবে। এ অবস্থায় পরিবার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো নিজ থেকেই জ্বালানি ব্যবহার কমাতে শুরু করতে পারে।

অন্যদিকে ওয়াল স্ট্রিটের ব্যাংকাররা সতর্ক করেছেন, জ্বালানির দাম বাড়তে থাকলে যুক্তরাজ্য মন্দার দিকে এগোবে। মরগান স্ট্যানলি জানিয়েছে, জ্বালানির দাম না কমলে ব্যাংক অব ইংল্যান্ড সুদের হার বাড়াতে পারে। আর তা ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ অর্থনৈতিক মন্দা ডেকে আনতে পারে।

সম্পর্কিত পোস্ট

মতামত দিন