আন্তর্জাতিক ডেস্ক :
অপার সৌন্দর্য্য, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং সমৃদ্ধ ইতিহাসের দেশ ইউক্রেন। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন বিভক্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ ছিল ইউরোপের এই দেশটি। এখন রাশিয়া আবার ইউক্রেনকে তার অংশ হিসেবে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে। ফলে দুই দেশের পরিস্থিতি ক্রমাগত উষ্ণতার দিকে মোড় নিচ্ছে। এই রাজনৈতিক অস্থিরতার বাইরে ইউক্রেনের ঐশ্বর্যমন্ডিত অবস্থিতি একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ হিসেবে স্থায়ীত্বের দাবি রাখে। এই নিবন্ধ সাজানো হয়েছে ইউক্রেন সম্পর্কে বিস্ময়কর কিছু তথ্য নিয়ে।
ইউক্রেনের ১০টি বিস্ময়কর তথ্য
১। ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ
রাশিয়ার পর আয়তনের দিক থেকে ইউক্রেন ইউরোপের বৃহত্তম দেশ। ৬০৩,৬২৮ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের দেশটির জনসংখ্যা অবশ্য সে তুলনায় অনেক কম; প্রায় ৪ কোটি ৩৬ লাখ।
২। ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট
ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের সাতটিই অবস্থিত ইউক্রেনে। এর মধ্যে রয়েছে কিয়েভের সেন্ট-সোফিয়া ক্যাথিড্রাল, লভিভের ঐতিহাসিক কেন্দ্র, চেরনিভ্সি বিশ্ববিদ্যালয়, কার্পেথিয়ানের অনন্য কাঠের গির্জা এবং সেগুলোর চারপাশে বিচ গাছের বন।
তীর্থযাত্রীরা সোফিয়া কিভস্কা গির্জা এবং সেন্ট মাইকেলের গোল্ডেন-গম্বুজ মঠ দেখার জন্য নিয়মিত আসেন অনেক দূর-দূরান্ত থেকে।
৩। ভূতুড়ে শহরের দেশ
বিশ্বের সবচেয়ে মারাত্মক পারমাণবিক বিপর্যয় ঘটেছিলো ইউক্রেনের চেরনোবিল পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে। প্ল্যান্টের ৩০-কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে থেকে ৩৫০,০০০ নিবাসীকে সরিয়ে নেওয়া হয়। এরপর থেকে এর চারপাশের অঞ্চলগুলো জনবসতিহীন রয়ে গেছে। কিছু বয়স্ক বাসিন্দা সরকারি নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ওখানে ফিরে গিয়েছিল। সেখানে বেশ কয়েকটি পরিত্যক্ত শহর রয়েছে, বিশেষত প্রিপিয়াত-এর ভূতুড়ে পরিবেশ দেখার জন্য প্রায় পর্যটকরা ভীড় করে। তাদেরকে যথাযথ নিরাপত্তার বেষ্টনীতে রেখে নির্দিষ্ট সীমারেখার মধ্যে ভ্রমণ করানো হয়। আরও প্রায় ২৪ হাজার বছর লাগবে এই অঞ্চলগুলো মানুষের বসবাসযোগ্য হতে।
৪। ঐতিহাসিক কিয়েভের যুদ্ধ
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪১ সালে জার্মানরা যখন ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভকে ঘিরে ফেলে, তখন সাধারণ শহরবাসীরা তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। শেষ পর্যন্ত হেরে গেলেও কোনো রকম যুদ্ধ ছাড়াই হাল ছেড়ে দেয়নি সাধারণ মানুষ। নাৎসিদের বিরুদ্ধে তাদের দুর্দান্ত প্রতিরোধের জন্য তাদেরকে সোভিয়েত সরকার বীরের মর্যাদা দিয়েছিল।
৫। বিশ্বের গভীরতম মেট্রো স্টেশন
কিয়েভ শহরের মেট্রো লাইনে অবস্থিত আর্সেনালনা বর্তমান সময়ে বিশ্বের গভীরতম মেট্রো স্টেশন। ১০৫.৫ মিটার গভীর এই স্টেশনে যাওয়ার জন্য একটি এসকেলেটরে করে পাঁচ মিনিটে যাত্রীদের ট্রেনের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। কিয়েভ শহরকে ঘিরে থাকা ডিনিপার নদীকে বাইপাস করতেই মূলত এত গভীর মেট্রো স্টেশন করা।
৬। বিশ্বের বৃহত্তম সূর্যমুখী বীজ উৎপাদনকারী দেশ
ইউক্রেন বিশ্বের বৃহত্তম সূর্যমুখী বীজ উৎপাদক। অনুমান করা হয় যে, ইউক্রেনের সূর্যমুখী কৃষি জমির মোট আকার পুরো স্লোভেনিয়ার সমান হতে পারে।
৭। নিয়ান্ডারথালদের বসতি
ইউক্রেন প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলো পূর্বে নিয়ান্ডারথালদের বসতি ছিল। এগুলোর মধ্যে মোলোডোভা সাইটগুলো ৪৩ থেকে ৪৫ হাজার খ্রিস্টপূর্বের। নিয়ান্ডারথালরা মূলত প্রাচীন মানুষের একটি উপ-প্রজাতি, পৃথিবীতে যাদের বিচরণ ছিল প্রায় ৪০,০০০০ বছর আগে। আধুনিক মানুষের তুলনায় নিয়ান্ডারথালরা ছিলো অনেক গুণ শক্তিশালী। তবে তাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো আনুপাতিকভাবে ছোট ছিল।
৮। বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম গম উৎপাদনকারী দেশ
ইউক্রেনকে এক সময় বলা হতো ‘ইউরোপের রুটির ঝুড়ি’। সোভিয়েত ইউনিয়নের গমের একটি বিশাল যোগান দেওয়া হতো এই ইউক্রেন অঞ্চল থেকে। উর্বর কালো মাটি সহ ইউক্রেনের বিস্তীর্ণ আবাদযোগ্য জমি একে গম এবং অন্যান্য খাদ্য শস্যের জন্য একটি আদর্শ জায়গা করে তুলেছে। এখনো ইউক্রেন বিশ্বের বৃহত্তম গম উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে একটি।
৯। গ্যাস ল্যাম্প উদ্ভাবন
১৮৫৩ সালে এলভিভ এর দুই ফার্মাসিস্ট – জ্যান জি এবং ইগন্যাসি লুকাসিউইজ গোল্ডেন স্টার নামে একটি দোকানে উদ্ভাবন করেন গ্যাস ল্যাম্প। আজও একই বিল্ডিংয়ের গ্যাসোভা ল্যাম্পা নামে একটি ক্যাফেতে এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের কৃতিত্ব স্মরণ করা হয়।
১০। সবচেয়ে ভারী ওজন বোঝাইকারী উড়োজাহাজ
এএন-২২৫ এখন পর্যন্ত বিশ্বের সবচেয়ে ভারী বিমান, যার সর্বোচ্চ ৭১০ টন ওজন নিয়ে উড্ডয়ন করতে পারে। একটি আইটেমের বোঝা বহনের ক্ষেত্রে এর সর্বোচ্চ ৪১৮,৮৩০ পাউন্ড ওজন তোলার রেকর্ড আছে। আর সর্বমোট বোঝা বহনে সর্বোচ্চ ৫৫৯,৫৮০ পাউন্ড ওজন সরিয়েছে এএন-২২৫। সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ থাকার সময় ইউক্রেনে নির্মিত হয়েছিল অ্যান্তোনোভ এএন-২২৫ ম্রিয়া। এছাড়া বিমানটির ডানাগুলোও বিশ্বের অন্যান্য সাধারণ বিমানের মধ্যে সবচেয়ে লম্বা। যদিও ২৭ ফেব্রুয়ারি রাশিয়ার হামলায় উড়োজাহাজটি ধ্বংস হয়েছে।
শেষাংশ
এই বৈশিষ্ট্যগুলো ইউক্রেনকে ইউরোপের অন্য দেশগুলো থেকে বিশেষভাবে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে। এরপরেও ত্রিশ বছর বয়সী দেশটি রাশিয়ার সাথে দীর্ঘ আট বছরের সংঘর্ষে অনেকটা ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। ইউক্রেনের উপর রাশিয়ার সাম্প্রতিক হামলাটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর অন্য রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় আক্রমণ।
