স্বাস্থ্য ডেস্ক :
অনিয়মের অভিযোগে হেয়ার ট্রান্সপ্লান্ট অ্যান্ড কসমেটিক সার্জারি সেন্টারসহ বেশ কয়েকটি হাসপাতাল ও ক্লিনিক এবং ডায়াগনস্টিক সেন্টার বন্ধ করে দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। সোমবার (২৯ আগস্ট) রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করেছে স্বাস্থ্য অধিদফতর কর্তৃপক্ষ।
তিন মাসের আল্টিমেটামেও চরিত্র বদলায়নি দেশের হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর। স্বাস্থ্য অধিদফতরের অভিযানে বেরিয়ে আসছে অনিয়ম আর প্রতারণার অভিনব সব কায়দা-কৌশল। চিকিৎসকের বদলে নার্স দিয়ে লেজার ট্রিটমেন্টের পাশাপাশি লাইসেন্স ছাড়াই সেবা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার প্রমাণ মিলেছে অভিযানে। কর্তৃপক্ষ বলছে, বহুবার সুযোগ দেয়ার পরও যাদের চরিত্র বদলায়নি সেসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ করাসহ মালিকপক্ষের বিরুদ্ধে নেয়া হবে কঠোর ব্যবস্থা।
চুল পড়া রোধ ও টাক মাথায় চুল গজানোর উপায় নিয়ে পরামর্শমূলক ভিডিও ছাড়ায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। ভিডিওটির শেষে চিকিৎসার জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে ঢাকার বানানীর একটি প্রতিষ্ঠানে। হেয়ার ট্রান্সপ্লান্ট অ্যান্ড কসমেটিক সার্জারি সেন্টার নামক ওই প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের ফেসবুক পেজে গত ১৪ মে আপলোড করে ভিডিওটি।
বনানীর ১১ নম্বর সড়কের প্রতিষ্ঠানটিতে ঘুরে দেখা যায় বলিউড-ঢালিউডসহ রূপালী জগতের তারকাদের ছবিতে ভরা চারপাশের দেয়াল। বাদ যায়নি ক্রিকেটাঙ্গনও। তবে সব ছবিতেই মনোজ খান্না নামক ভারতীয় যে চিকিৎককের ছবি রাখা হয়েছে, তিনি ২০১৮ সালের পর বাংলাদেশে আসেননি একবারও। এমনকি তার বাংলাদেশে চিকিৎসা করারও নেই কোনো অনুমতি। শুধু চিকিৎসকের চটকদার ছবি দিয়েই নয়, প্রতিষ্ঠানটিতে চিকিৎকের বদলে নার্স দিয়ে করানো হতো লেজার ট্রিটমেন্ট। সোমবার (২৯ আগস্ট) স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালিত অভিযানে উঠে আসে এমন নানা অনিয়ম আর অপরাধের চিত্র।
অভিযানে স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক ডা. আহমেদুল কবির বলেন, বারবার আল্টিমেটাম দেয়ার পরও এখনও যেসব প্রতিষ্ঠান অনিয়ম ও প্রতারণা বন্ধ করেনি তাদের বিরুদ্ধে নেয়া হচ্ছে কঠোর ব্যবস্থা।
আহমেদুল কবির আরও বলেন, এখানে হেয়ার ট্রান্সপ্লান্ট, লেজার ট্রিটমেন্ট, ফিজিওথেরাপিসহ চুলের নানা চিকিৎসা করা হয়। তারা বলছে, তারা নাকি জানতো না যে, লেজার ট্রিটমেন্টের জন্য অধিদফতরের অনুমোদনের দরকার হয়। এজন্য আমরা এই প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ করে দিয়েছি। এছাড়াও এখানে ভারতের যে চিকিৎসক মনোজ খান্না লেজার ট্রিটমেন্ট চিকিৎসা দিয়ে থাকেন বলে যে ছবি লাগানো হয়েছে, কিন্তু তিনি এখানে চিকিৎসা দিতে আসেন না।
এ সময় প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ জানায়, আমরা জানতাম না লেজার ট্রিটমেন্টের জন্য যে অনুমোদন লাগবে। স্বাস্থ্য অধিদফরতর জানিয়েছে এখানে হেয়ার ট্রান্সপ্লান্টের পরিবেশ নেই।
এদিকে অবৈধভাবে স্বাস্থ্য সেবা দেয়ার অভিযোগে গত জুন মাসে ঢাকা জেনারেল হাসপাতালের কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশনা দেয়া হয়। আদেশ অমান্য করে ফের কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিল প্রতিষ্ঠানটি। অনিবন্ধিত ক্লিনিক ডায়াগনস্টিক সেন্টার বন্ধে স্বাস্থ্য অধিদফতরের দ্বিতীয় দফা অভিযানের প্রথম দিনেই হাসপাতালটিকে আবারও বন্ধ ঘোষণা করা হয়। দুপুরে স্বাস্থ্য অধিদফতরের সহকারী পরিচালক ডা. মাহমুদুর রহমানের নেতৃত্বে এ অভিযান পরিচালনা করা হয়।
এ অভিযান প্রসঙ্গে মাহমুদুর রহমান বলেন, এর আগে গত জুন মাসে এ হাসপাতালটিতে এসেছিলাম তখনই বন্ধের নির্দেশনা দিয়েছিলাম, কিন্তু আামাদের প্রচলিত আইনকে উপেক্ষা করে তারা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এখানে তারা নিয়মিত রোগী ভর্তি করছে, অপারেশনসহ নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষাও করছে। আমাদের যে অর্ডিন্যান্স আছে, সে অনুযায়ী কোনো প্রতিষ্ঠান লাইসেন্স পাওয়ার আগে সেটি চালু করার কোনো সুযোগ নেই। আমরা যে দুইটি প্রতিষ্ঠানে গিয়েছি, খিদমাহ লাইফ কেয়ার এবং ঢাকা জেনারেল হাসপাতাল, দুইটাই অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান, তাদের কোনো লাইসেন্স আমাদের দেখাতে পারেনি।
তিনি আরও বলেন, তারা বলেছে লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেছে, কিন্তু এখনও লাইসেন্স পায়নি। কিন্তু আমরা এখানে দেখতে পাচ্ছি যে, অপারেশন থিয়েটার থেকে শুরু করে অন্য যেসব কার্যক্রম চলছে, জায়গাতেই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ বিরাজ করছে। এখানে মেয়াদ উত্তীর্ণ মেটারিয়ালসও ব্যবহার করা হচ্ছে।
খিদমাহ লাইফ কেয়ার এবং ঢাকা জেনারেল হাসপাতাল ছাড়াও এর আগে আরও দুটি হাসপাতালে অভিযান পরিচালনা করে কার্যক্রম বন্ধ করে দেয় স্বাস্থ্য অধিদফতর। সেগুলো হলো খিলগাঁও জেনারেল হাসপাতাল ও মাতুয়াইলের কনক জেনারেল হাসপাতাল।
ঢাকায় দুপুর ১২টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত এ অভিযান চালানো হয়। অনিবন্ধিত হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিক বন্ধে ঢাকাসহ সারা দেশে স্বাস্থ্য অধিদফতর এ অভিযান পরিচালনা করছে।
দুপুর ১টায় স্বাস্থ্য অধিদফতরের সহকারী পরিচালক মাহমুদুর রহমান অভিযান চালিয়ে নিবন্ধন না থাকায় খিলগাঁও রেলগেট এলাকায় খিলগাঁও জেনারেল হাসপাতাল বন্ধ করে দেন। তবে এ সময় হাসপাতালটিতে চারজন রোগী ভর্তি থাকায় বন্ধ করার জন্য ২৪ ঘণ্টা সময় দেয়া হয়।
তিনি বলেন, আমাদের অভিযান চলমান থাকবে।
এর আগে গত ২৬ মে হাসপাতাল ও ক্লিনিকের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে অনুমোদনহীন ১ হাজার ৬৪১টি প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয় স্বাস্থ্য অধিদফতর।
