বাণিজ্য ডেস্ক :
ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় পশ্চিমা বিশ্ব। জবাবে ইউরোপে গ্যাস ও জ্বালানি সরবরাহ সীমিত করে দেয় রাশিয়া। এর প্রভাবে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির পাশাপাশি ইউরোপের দেশে দেশে বেড়ে গেছে বিদ্যুতের দামও। পাশাপাশি আকাশচুম্বী দামে বিক্রি হচ্ছে কয়লা, গ্যাস, তেলসহ ধরনের জ্বালানি।
রাশিয়া থেকে গ্যাস আমদানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল ইউরোপ। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর আগের বছর ২০২১ সালে রাশিয়া থেকে ১৫৫ বিলিয়ন কিউবিক মিটার গ্যাস আমদানি করে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো। যা তাদের মোট গ্যাসের চাহিদার ৪০ শতাংশেরও বেশি।
তবে রাশিয়ার ওপর এ জ্বালানি নির্ভরতার কারণে বর্তমানে ইউরোপকে ভুগতে হচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে মস্কোর ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়ায় বাড়তি দামে বিকল্প উৎস থেকে তাদের জ্বালানি আমদানি করতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে ইউরোপে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ বেড়ে গেছে। জ্বালানি ও বিদ্যুতের বাড়তি খরচ এরইমধ্যে মূল্যস্ফীতিতে ধুঁকতে থাকা ইউরোপীয় জনগণের জীবনযাত্রায় মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে।
এরমধ্যেই নতুন করে শঙ্কা জাগাচ্ছে আসন্ন শীতকাল। সামনের শীতকালে ঘর গরম করতে গিয়ে বাড়তি বিদ্যুৎ বিলের বোঝা চাপবে সাধারণ মানুষের কাঁধে। এতে ইউরোপের দেশে দেশে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। অবিলম্বে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনার উপায় বের করতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বেলজিয়ামের জ্বালানি মন্ত্রী টিন ভ্যান ডার স্ট্রাতেন।
সহসা এ সংকট কাটার লক্ষণ নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, আগামী ৫ থেকে ১০ বছরের শীতকালে এমন জ্বালানি সংকট থাকবে। তাই বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহনের জন্য ইইউ’র প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর ইউরোপে রেকর্ড হারে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম বেড়েছে। পরমাণু শক্তির পর ইউরোপে সবচেয়ে বেশি প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়।
পরিস্থিতি সামাল দিতে এরইমধ্যে ইউরোপের দেশগুলো শীতকালের প্রস্তুতি হিসেবে গ্যাস আমদানি করে জমিয়ে রাখতে শুরু করেছে। প্রত্যেক সদস্য দেশে থাকা গ্যাসের রিজার্ভারগুলো আগামী নভেম্বরের আগেই ৮০ শতাংশ ভরিয়ে ফেলার নির্দেশনা দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন।
তবে রাশিয়া থেকে গ্যাস সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় এ লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হওয়া নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
নিজেদের গ্যাস রিজার্ভারগুলো আগামী অক্টোবরের মধ্যেই ৮৫ শতাংশ এবং নভেম্বরের আগে ৯০ শতাংশ ভরিয়ে ফেলার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে জার্মানি। তবে রাশিয়ায় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দিলে জার্মানির পক্ষে এ লক্ষ্য পূরণ করা সম্ভব নাও হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নর্ডস্ট্রিম ওয়ান পাইপলাইন দিয়ে রাশিয়া থেকে সবচেয়ে বেশি গ্যাস আমদানি করে জার্মানি। আগামী ৩১ আগস্ট থেকে মেরামতের অজুহাত দেখিয়ে ৩ দিন এ পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে রাশিয়া।
জার্মানির পাশাপাশি বুলগেরিয়া, হাংগেরি ও রোমানিয়াসহ আরও বেশ কয়েকটি দেশ তাদের রিজার্ভারগুলো পূর্ণ করার এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারবে না বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে জ্বালানি অস্ত্রকে আরও ব্যাপকভাবে পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করবেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। এমন আশঙ্কা দেখা দিয়েছে ইউরোপের দেশে দেশে। এর মধ্যেই মেরামতের নাম করে ইউরোপের জ্বালানি নিরাপত্তায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নর্ডস্ট্রিম ওয়ান পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেয়া ইউরোপীয়দের মধ্যে নতুন আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। ৩ দিনের মেরামত শেষে এ পাইপলাইনে রাশিয়া আবার গ্যাস সরবরাহ শুরু করবে কি না, সে ব্যাপারেও রয়েছে অনিশ্চয়তা।
ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর আগে ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের চাহিদার অধিকাংশ গ্যাস রাশিয়া থেকে আমদানি করত। তবে যুদ্ধ শুরুর পর রাশিয়াকে শাস্তি দিতে ২০২৭ সালের মধ্যে মস্কোর গ্যাসের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনার পরিকল্পনা নেয় তারা। চলতি আগস্ট মাস থেকে রাশিয়া থেকে কয়লা আমদানি বন্ধ করেন তারা। পাশাপাশি আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে রাশিয়া থেকে সমুদ্রপথে সব ধরনের তেল আমদানি এবং ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে সব ধরনের পেট্রোলিয়াম পণ্যের আমদানি বন্ধের ঘোষণা দেন তারা।
