আন্তর্জাতিক ডেস্ক :
আল জাজিরার খ্যাতনামা সাংবাদিক শিরিন আবু আকলেহ হত্যাকাণ্ডের পর একশ দিন পার হয়ে গেছে। ইসরাইলি বাহিনীর গুলিতে নিহত হওয়ার সব তথ্য-প্রমাণ থাকার পরও এখনও ন্যায়বিচার বিচার পায়নি তার পরিবার। লোমহর্ষক ওই হত্যাকাণ্ডের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য এখনও যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কাছে আকুতি জানাচ্ছেন তারা। কিন্তু নিজ দেশের নাগরিক আকলেহ’র ন্যায়বিচারে অনীহা দেখাচ্ছে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন সরকার।
আবু আকলেহ একজন ফিলিস্তিনি-আমেরিকান সাংবাদিক। ফিলিস্তিনে ইসরাইলি দখলদারিত্ব নিয়ে একটানা ২৫ বছর কাজ করেছেন তিনি। এজন্য আরব বিশ্বে ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু চলতি বছরের ১১ মে দখলকৃত পশ্চিম তীরের জেনিনে এক শরণার্থী শিবিরে সংবাদ সংগ্রহের সময় এক ইসরাইলি স্নাইপার মাথায় গুলি করে তাকে হত্যা করে।
আল জাজিরার হয়ে পেশাগত দায়িত্ব পালন করছিলেন আকলেহ। সেদিন মাজদি বানৌরা নামে আল জাজিরার এক ক্যামেরাম্যানসহ একদল সাংবাদিকের সঙ্গেই ছিলেন তিনি। সে সময় তাদের সবার জ্যাকেট ও হেলমেটে ‘প্রেস’ লেখা ছিল। এরপরও শিরিনকে লক্ষ্য করে সরাসরি গুলি চালায় এক ইসরাইলি স্নাইপার। হত্যার মুহূর্তের একটা দৃশ্যও ক্যামেরায় রেকর্ড করেছিলেন মাজদি।
এরপর তিন মাসেরও বেশি সময় পার হয়ে গেলেও আকলেহ’র হত্যার ন্যায়বিচার অধরাই থেকে গেছে। তার পরিবার বারবার আকুতি জানিয়ে আসলেও এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপই নেয়নি প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সরকার। উল্টো ওয়াশিংটন ইসরাইলকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
গত মাসে মধ্যপ্রাচ্য সফরের অংশ হিসেবে প্রথমেই ইসরাইল সফর করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাইডেন। এ সময় আকলেহ’র পরিবার তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চাইলেও তা অগ্রাহ্য করেন তিনি। এরপরও আকলেহ’র পরিবার ওয়াশিংটনেও প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়।
আকলেহ’র পরিবার এখন বলছে, হাজারো তথ্য-প্রমাণ ও ইসরাইলকে দায়ী করে বেশ কয়েকটি তদন্ত থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র ন্যূনতম পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। ‘কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের উচিৎ তার নিজ নাগরিক ও সাংবাদিক হত্যার বিষয়ে একটি স্বাধীন তদন্তের পদক্ষেপ নেয়া’-সম্প্রতি আল জাজিরাকে এক সাক্ষাৎকারে বলেন আবু আকলেহ’র ভাইঝি লিনা আবু আকলেহ।
আল জাজিরার সিনিয়র রিপোর্টার আবু আকলেহ হত্যাকাণ্ডের পর প্রথম থেকেই খুটিনাটি নানা বিষয়ে টানা রিপোর্ট করে যাচ্ছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যমটি। এসব রিপোর্ট ছাড়াও হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী একাধিক সাক্ষী রয়েছেন। এছাড়া জাতিসংঘ ও ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ ও (পিএ) ওয়াশিংটন পোস্ট, নিউইয়র্ক টাইমস ও সিএনএনের মতো বেশ কয়েকটি মার্কিন সংবাদমাধ্যম হত্যাকাণ্ড নিয়ে তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
সব তদন্ত প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে, এক ইসরাইলি স্নাইপার গুলি করে আবু আকলেহকে হত্যা করেছে। কিন্তু একমাত্র মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, যে বুলেটে সাংবাদিক শিরিন নিহত হন তার ‘উৎপত্তির বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেননি’ তদন্তকারীরা। তবে যুক্তরাষ্ট্রের এমন প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে ফিলিস্তিন।
আবু আকলেহ হত্যার প্রায় দুই মাস পর গত ৪ জুলাই একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘সম্ভবত’ ইসরাইলি অবস্থান থেকে ‘অনিচ্ছাকৃত’ বন্দুকের গুলিতে নিহত হন সাংবাদিক শিরিন। তবে তাকে আঘাতকারী বুলেটের উৎস সম্পর্কে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেননি তদন্তকারী দল।
মার্কিন বিশেষজ্ঞদের মতে, সাংবাদিক শিরিনকে আঘাতকারী বুলেটটি বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যার কারণে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত নেয়া যায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের ওই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে ফিলিস্তিন।
শিরিনের হত্যাকাণ্ডে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের এমন ভূমিকার সমালোচনা করে তার স্বজন ও সহকর্মীরা বলছেন, বুলেটটি একমাত্র প্রমাণ নয়। সাক্ষী, আঘাতের স্থান, গুলির অবশিষ্টাংশসহ অন্যান্য প্রমাণও রয়েছে। কিন্তু ইসরাইলকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে ওয়াশিংটন। তবে তাদের এ চেষ্টা ব্যর্থ হবে।
তারা আরও বলেন, ‘আমরা ন্যায়বিচারের জন্য চেষ্টা অব্যাহত রাখব। একটি স্বাধীন সংস্থার মাধ্যমে স্বচ্ছ তদন্ত করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। আমরা জাতিসংঘ এবং আইসিসিকে তদন্ত চালিয়ে যাওয়ার এবং ইসরাইলকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার দাবি জানাই। তাদের দায়মুক্তির কোনো সুযোগ নেই।’
মার্কিন প্রতিবেদনের বিষয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরে ইসরাইল। সাংবাদিক শিরিনের মৃত্যুর বিষয়টি এখনও পরিষ্কার নয় দাবি করে ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী বেনি গানৎজ বলেন, ‘সাংবাদিক আবু আকলেহ’র মৃত্যুর ঘটনায় আমরা শোক জানাতে চাই।’
গানৎজ আরও বলেন, ‘ইসরাইলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সত্য উদঘাটনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ময়নাতদন্ত সত্ত্বেও সুনির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, গুলি চালানোর উৎস নির্ধারণ করা কখনোই সম্ভব নয়। তবে এ বিষয়ে তদন্ত চলবে।’
