জাতীয় ডেস্ক :
বলেশ্বর নদীর তীরবর্তী জিলবুনিয়া গ্রাম। ইটের সোলিং দেওয়া রাস্তার পাশে আবু গাজীর বাড়ি। ভোর থেকেই সেখানে দীর্ঘ লাইন। কারণ, সম্পূর্ণ নষ্ট অনেক পিএসএফ-এর মধ্যে এই একটি পিএসএফ আংশিক ভালো আছে। এখানে ৫ কলস বিশুদ্ধ পানি তুলতে ৫০ কলস পানি ঢালতে হয়। তবু এলাকাবাসীর ভরসা এই পিএসএফ-ই। বিকল্প কোনো উপায় না থাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় গ্রামবাসীকে।
দক্ষিণ জিলবুনিয়া গ্রামের মধ্যবয়সী এক নারী খাদিজা বেগম। তার ভাষায়, ‘বাবা, পিএসএফ-এর টিউবওয়েলের মাথা নেই। পাশের পুকুর দিয়ে ৫০ কলস পানি ঢাইল্ল্যা দিয়া হেরপর ৫ কলস পানি নেওয়া লাগে। এই কষ্টের চেয়ে মরণ ভালো।’
বুধবার (৬ এপ্রিল) সকালে এই পিএসএফ-এর সামনে দাঁড়িয়ে এভাবেই কষ্টের কথা জানাচ্ছিলেন খাদিজা বেগম।
নাজমা বেগম নামের অপর এক নারী বলেন, ‘সাপ্লাই নেই, টিউবওয়েল নেই, ট্যাংক নেই, কিছুই নেই। শুধু আছে পানির জন্য হাহাকার। এক কলস পানির জন্য রোজা রেখে আধা কিলোমিটার দূর থেকে এসে দাঁড়িয়ে আছি তিন ঘণ্টা।’ বর্ষার পানি সারা বছর ধরে রেখে খাওয়ার জন্য সরকারের কাছে একটি বড় ট্যাংকের দাবি জানান তিনি।
পার্শ্ববর্তী রায়েন্দা গ্রামের ফরিদ হোসেন বলেন, ‘আমাদের এলাকায় কোনো টিউবওয়েল বসে না। পুকুর ও বৃষ্টির পানির ওপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু প্রচণ্ড গরমের কারণে পুকুরের পানি শুকিয়ে গেছে। আশপাশের খালে লবণাক্ত পানি। বাধ্য হয়ে লবণ পানি গোসল, রান্না ও খাওয়ার কাজে ব্যবহার করতে হয়। এই পানি খেয়ে মাঝে মাঝে পেটে ব্যথা ও অসুস্থ হয়ে পড়ি। আমরা খুব সমস্যায় আছি।’
একই চিত্র দেখা যায় বাগেরহাটের রামপাল, মোংলা, মোরেলগঞ্জ ও কচুয়া উপজেলায়। একদিকে উপজেলাগুলোতে গভীর ও অগভীর নলকূপ বসে না। অপরদিকে পিএসএফগুলো নষ্ট ও শুষ্ক মৌসুমে পুকুরের পানি শুকিয়ে যাওয়ায় দূষিত পানি পান করে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে কয়েক লাখ মানুষ।
মোরেলগঞ্জ উপজেলার চালিতাবুনিয়া গ্রামের মোতালেব হাওলাদার বলেন, ‘বিভিন্ন সময় সরকারি ও বেসরকারিভাবে সুপেয় পানির জন্য পিএসএফ তৈরি করে দেয়। কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে পুকুরে পানি থাকে না বিধায় পিএসএফগুলো কোনো কাজে আসে না। আমরা সরকারের কাছে প্রতি বাড়িতে একটি করে ট্যাংক দেওয়ার দাবি জানাই।’
চার মাইল হেঁটে পানি নিতে আসেন মোংলা উপজেলার চাঁদপাই ইউনিয়নের কানাইনগর গ্রামের শিউলী বেগম। আসা-যাওয়ায় এক ঘণ্টারও বেশি সময় লাগে জানিয়ে তিনি বলেন, প্রতিদিন রান্না করতে ও খেতে চার কলস পানি লাগে। সকালে দুবার পানি আনতে যাই। বিকেলে দুবার যাই। সারা দিনে পানির জন্য চার ঘণ্টা সময় যায়। আমাদের কষ্টের কোনো শেষ নেই।’
কচুয়া উপজেলার বারুইখালী গ্রামের আবুল হোসেন বলেন, ‘কয়েক দিন ধরেই তীব্র পানির সংকটে ভুগছি আমরা। দূর-দূরান্তের পুকুর থেকে অনেক কষ্ট করে খাবার পানি আনতে হয়।’ এ অবস্থায় শুষ্ক মৌসুমে বিশুদ্ধ পানি সংরক্ষণের জন্য সরকারের কাছে দাবি জানান তিনি।
শরণখোলা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান মিলন বলেন, ‘আমাদের উপজেলার চারটি ইউনিয়নে লবণাক্ততার কারণে অগভীর নলকূপ স্থাপন হয় না। দেড় লক্ষাধিক মানুষ পুকুর ও বৃষ্টির পানির ওপর নির্ভর করে তৃষ্ণা মেটায়। কিন্তু এবার একদিকে প্রচণ্ড গরম, অন্যদিকে বৃষ্টি না হওয়ায় পানির উৎসগুলোতে কোনো পানি নেই। ফলে মানুষের মাঝে খাবার পানির জন্য হাহাকার চলছে।’ পানি সংকট নিরসনে নতুন পরিকল্পনা, মজা পুকুর পুনর্খনন, পিএসএফগুলো সংস্কার করে ব্যবহার উপযোগী এবং পরিবারভিত্তিক ট্যাংক সরবরাহের দাবি জানান তিনি।
শরণখোলা উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা প্রিয় গোপাল বিশ্বাস বলেন, এ এলাকায় শুষ্ক মৌসুমে সুপেয় পানির সংকট রয়েছে। হাসপাতালে নানা বয়সী মানুষ পানিবাহিত রোগ নিয়ে ভর্তি হয়। প্রতিদিন ১০-১২ জন পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়। বিশুদ্ধ পানি নিশ্চিত করা হলে স্বাস্থ্যঝুঁকি কমবে বলে জানান এই স্বাস্থ্য কর্মকর্তা।
বাগেরহাট জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের নির্বাহী প্রকৌশলী জয়ন্ত মল্লিক বলেন, ‘বাগেরহাটের উপকূলীয় উপজেলাগুলোতে তীব্র পানির সংকট দেখা দিয়েছে। এই সংকট নিরসনে পিএসএফ সংস্কার, পুকুর খননসহ আমরা বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। এ ছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় মোবাইল ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের মাধ্যমে আমরা মানুষের সুপেয় পানির চাহিদা নিশ্চিত করে থাকি।’
