হোম জাতীয় ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার কারণ জানালো সরকার

‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার কারণ জানালো সরকার

কর্তৃক Editor
০ মন্তব্য 53 ভিউজ

নিউজ ডেস্ক:
আসন্ন গণভোটে জনগণকে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আসছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। ইতোমধ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচিও নিয়েছে তারা। তবে, বিষয়টি নিয়ে শুরু হয়েছে বিতর্ক। অনেকে সরকারের ‘হ্যাঁ’ ভোটের কর্মসূচি প্রশ্ন তুলছে। অবশেষে বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলেছে অন্তর্বর্তী সরকার।

রবিবার (১৮ জানুয়ারি) এক বার্তায় অন্তর্বর্তী সরকার ও ‘হ্যাঁ’ ভোটের বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং।

প্রেস উইং জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে কিছু মন্তব্যে বলা হয়েছে, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার বিষয়ে জুলাই জাতীয় সনদ-২০২৫ বাস্তবায়নের ওপর আসন্ন গণভোটে “হ্যাঁ”ভোটের পক্ষে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের প্রকাশ্য সমর্থন একটি অন্তর্বর্তী প্রশাসনের নিরপেক্ষতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে। এই উদ্বেগ আলোচনার যোগ্য হলেও বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা, অন্তর্বর্তী সরকারের ম্যান্ডেট এক্স আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক চর্চার আলোকে মূল্যায়ন করলে এ ধরণের সমালোচনার ভিত্তি নেই। বাংলাদেশের এই সংকটময় সময়ে নীরবতা নিরপেক্ষতার প্রতীক নয়, বরং তা দায়িত্বশীল নেতৃত্বের অভাবই ফুটিয়ে তোলে।

‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে ছয়টি যুক্তি দেখিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। সেগুলো হলো:

১. অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ম্যান্ডেট সংস্কার, আনুষ্ঠানিকতা নয়

বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শুধু দৈনন্দিন রাষ্ট্র পরিচালনা বা নিরপেক্ষ নির্বাচন তত্ত্বাবধানের জন্য গঠিত হয়নি। এটি দীর্ঘদিনের অপশাসনের ফলে সৃষ্ট শাসনতান্ত্রিক সংকট, জনঅনাস্থা ও প্রাতিষ্ঠানিক চরম দুর্বলতার প্রেক্ষাপটে সৃষ্ট গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গঠিত সরকার। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত যে এই সরকারের মূল দায়িত্ব হলো রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল করা, গণতান্ত্রিক বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধার করা এবং নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের আগে প্রয়োজনীয় সংস্কারের একটি গ্রহণযোগ্য কাঠামো তৈরি করা।

প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে অধ্যাপক ইউনূস গত ১৮ মাসে রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, পেশাজীবী ও তরুণদের সঙ্গে ব্যাপক পরামর্শের মাধ্যমে যে সংস্কার প্রস্তাব তৈরি করেছেন, বর্তমান সংস্কার প্যাকেজ তারই ফল। তাই এই সংস্কারের পক্ষে অবস্থান না নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের মূল উদ্দেশ্যেকে ভুলভাবে বুঝার শামিল। অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কারের দায়িত্ব নিয়ে গঠিত, গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্তের মুহূর্তে সেই সংস্কার থেকে সেই সরকার নিজেকে দূরে রাখবে—এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়।

২. সুপরামর্শ গণতান্ত্রিক পছন্দের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ

অন্তর্বর্তীকালীন হোক বা নির্বাচিত হোক আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক চর্চায় সরকার প্রধানদের গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক বা প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন নিয়ে নীরব থাকার বাধ্যবাধকতা নেই। বরং, গণতন্ত্রে প্রত্যাশা করা হয়, নেতারা জাতীয় স্বার্থে প্রয়োজনীয় নীতি ও সংস্কারের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরবেন এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জনগণের ওপর ছেড়ে দেবেন।

অন্যান্য অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও গণভোট কোনও টেকনোক্র্যাটিক প্রক্রিয়া নয়। এটি সরাসরি জনগণের মতামত জানার মাধ্যম। সরকারের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা যখন স্পষ্টভাবে তাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন, তখন ভোটারদের সিদ্ধান্ত আরও তথ্যভিত্তিক ও অর্থবহ হয়।

গণতান্ত্রিক বৈধতার মূল প্রশ্ন হলো নেতারা অবস্থান নিলেন কি না তা নয় বরং, ভোটাররা সেই অবস্থান প্রত্যাখ্যান করতে স্বাধীন কি না, বিরোধী পক্ষ প্রকাশ্যে প্রচারণা চালাতে পারছে কি না, পুরো প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য কি না, এসব শর্ত বর্তমান প্রেক্ষাপটে অক্ষুণ্ণ রয়েছে।

৩. এই মুহূর্তে বাংলাদেশের জন্য নেতৃত্ব অপরিহার্য

বাংলাদেশের সংস্কার গণভোট কোনও বিমূর্ত নীতিগত প্রশ্ন নয়, এটি দীর্ঘদিনের শাসনব্যর্থতার জবাব—যা বছরের পর বছর নাগরিক সমাজ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে উদ্বিগ্ন রেখেছে। প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করেছে, প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন নির্বাচন ও তত্ত্বাবধানকারী সংস্থার রাজনীতিকরণের মাধ্যমে দেশকে সংকটে ফেলেছে।

এই বাস্তবতায় সংস্কারের পক্ষে প্রধান উপদেষ্টার অবস্থান ধারাবাহিকতা ও জবাবদিহিতারই প্রকাশ। যিনি নিজে সংস্কারের সমস্যা চিহ্নিত করেছেন এবং সমাধানে ঐকমত্য তৈরির নেতৃত্ব দিয়েছেন, তার জন্য এখন নীরব থাকা হবে অসংগত ও দায়িত্বহীন। যে অন্তর্বর্তী নেতৃত্বের বৈধতা সংস্কার থেকে আসে, তাদের পক্ষে সংস্কারের পক্ষে কথা বলা পক্ষপাত নয় বরং, তা তাদের প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব।

৪. আন্তর্জাতিক নজির এই পদ্ধতিকে সমর্থন করে

এক্ষেত্রে বাংলাদেশ কোনও ব্যতিক্রম নয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় স্বীকার করবে যে বিশ্বজুড়ে বহু দেশে সরকার প্রধানরা গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় পরিবর্তনসংক্রান্ত গণভোটে প্রকাশ্যে পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। এসব ঘটনাকে গণতান্ত্রিক রীতির লঙ্ঘন হিসেবে নয়, বরং দায়িত্বশীল রাজনৈতিক নেতৃত্বের স্বাভাবিক প্রকাশ হিসেবেই দেখা হয়।

গণভোটের বৈধতা নেতাদের নীরবতার ওপর নির্ভর করে না, এটি নির্ভর করে ভোটারদের স্বাধীনভাবে পক্ষে বা বিপক্ষে মত দেওয়ার সুযোগের ওপর। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো, গণভোটের ফলাফলের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের কোনও নির্বাচনি স্বার্থ জড়িত নেই। ইউনূস ও তার উপদেষ্টারা ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করা, ব্যক্তিগত রাজনৈতিক লাভ বা দলীয় সুবিধা চান না। তাঁদের দায়িত্ব স্পষ্টভাবে সময়সীমাবদ্ধ ও অন্তর্বর্তী।

একবার সংস্কার গৃহীত বা প্রত্যাখ্যাত হলে তার বাস্তবায়ন বা পরিণতি বহন করবে নির্বাচিত সরকার। ফলে, অযথা প্রভাব বিস্তারের ঝুঁকি খুবই সীমিত এবং এই সমর্থনের সৎ উদ্দেশ্য স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়।

৫. সরকারি প্রচারণা মানেই জোরজবরদস্তি নয়

জেলা পর্যায়ে প্রচারণা চালানো নিয়ে যে উদ্বেগ রয়েছে, তা প্রেক্ষাপটসহ বিবেচনা করা প্রয়োজন। জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে পরিচালিত কার্যক্রমের মূল উদ্দেশ্যে হলো, সংস্কারের বিষয়বস্তু ও গুরুত্ব জনগণের কাছে স্পষ্ট করা। বিশেষ করে যেখানে ভুল তথ্য ও বিভ্রান্তি সচেতন অংশগ্রহণকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। ক্রান্তিকালীন সময়ে এ ধরণের সরকারি সম্পৃক্ততা স্বাভাবিক এবং এটিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অতিরিক্ত বা অনৈতিক প্রচারণা বলা যায় না। জনপরিসরে থাকা আলোচনায় সরকারের উপস্থিতি বিরোধী মত দমন করে না।

৬. নীতিগত লঙ্ঘন নয়, গণতান্ত্রিক দায়িত্ব

এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি সমর্থনে নয়, বরং দ্বিধা ও নীরবতায়। যে সংস্কারের জন্য অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়েছে তা সমর্থন না করলে জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ন হবে, ভোটাররা বিভ্রান্ত হবে এবং পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা নষ্ট হবে।

Khaleda

সম্পর্কিত পোস্ট

মতামত দিন