আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
সপ্তাহে পদার্পণ করা ইরান যুদ্ধের অবসান ঘটাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন ছয়টি কঠোর শর্তে আলোচনার প্রাথমিক প্রস্তুতি শুরু করেছেন। যদিও ট্রাম্প সম্প্রতি সামরিক অভিযান গুটিয়ে আনার ইঙ্গিত দিয়েছেন, তবে হোয়াইট হাউস প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো বলছে যে যুদ্ধের পরবর্তী ধাপ এবং সম্ভাব্য শান্তি চুক্তির রূপরেখা নিয়ে ইতিমধ্যে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা শুরু হয়েছে।
সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস নিউজ জানিয়েছে, ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জামাতা জ্যারেড কুশনার এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মূল কারিগর হিসেবে কাজ করছেন। ইরান যুদ্ধের সম্ভাব্য শান্তি আলোচনার রূপরেখা চূড়ান্ত করছে ট্রাম্পের প্রতিনিধি দল।
টানা তিন সপ্তাহের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন পরবর্তী ধাপ অর্থাৎ ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য শান্তি আলোচনার প্রাথমিক প্রস্তুতি শুরু করেছে। মার্কিন প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের বরাত দিয়ে এক্সিওস জানিয়েছে, শুক্রবার (২০ মার্চ) প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুদ্ধ ‘গুটিয়ে আনার’ ইঙ্গিত দিলেও মার্কিন কর্মকর্তাদের ধারণা, আরও অন্তত দুই থেকে তিন সপ্তাহ লড়াই চলতে পারে। এই অন্তর্বর্তী সময়েই ট্রাম্পের উপদেষ্টারা কূটনীতির প্রাথমিক ভিত্তি তৈরি করতে চাইছেন। এই আলোচনা প্রক্রিয়ায় ট্রাম্পের বিশেষ দূত জ্যারেড কুশনার এবং স্টিভ উইটকফ সরাসরি সম্পৃক্ত রয়েছেন বলে জানা গেছে।
যেকোনো শান্তি চুক্তির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র কতগুলো কঠোর শর্তারোপ করতে যাচ্ছে, যার মধ্যে রয়েছে হরমুজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত করা এবং ইরানের উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ সংক্রান্ত সংকটের স্থায়ী সমাধান।
এছাড়া ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং আঞ্চলিক প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন বন্ধের বিষয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদী চুক্তিতে পৌঁছানোকেও অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। যদিও সাম্প্রতিক দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি কোনো যোগাযোগ হয়নি, তবে মিসর, কাতার এবং যুক্তরাজ্য উভয় পক্ষের মধ্যে বার্তার আদান-প্রদান করছে। মিসর ও কাতার ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে জানিয়েছে যে ইরান আলোচনায় আগ্রহী, তবে তাদের শর্তগুলো বেশ কঠিন।
ইরানের পক্ষ থেকে প্রধানত তিনটি দাবি তোলা হয়েছে—অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি, ভবিষ্যতে পুনরায় আক্রমণ হবে না এমন গ্যারান্টি এবং যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ প্রদান। অন্যদিকে, মার্কিন কর্মকর্তাদের ধারণা ইরান আলোচনার টেবিলে আসতে বাধ্য হবে কারণ এই যুদ্ধে তাদের শক্তি অনেকটাই খর্ব হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কাছ থেকে ছয়টি সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি চাইছে, যার মধ্যে রয়েছে আগামী পাঁচ বছর কোনো ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি না রাখা, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা এবং গত বছর বোমা হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত নাতাঞ্জ, ইসফাহান ও ফোরডো পারমাণবিক স্থাপনাগুলো স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়া। এছাড়া হিজবুল্লাহ, হুথি বা হামাসের মতো প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোকে অর্থায়ন বন্ধের শর্তও দেওয়া হয়েছে।
বাস্তবতা হলো, ইরান অতীতেও এই ধরনের অনেক দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে এবং তেহরানের নেতারা এমন একজন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলোচনায় বসতে দ্বিধাবোধ করছেন যিনি আলোচনার মাঝপথেই হঠাৎ বোমা হামলার নির্দেশ দেন। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি শনিবার তার ভারতীয় প্রতিপক্ষকে জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালী স্বাভাবিক করতে হলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে হামলা বন্ধ করতে হবে এবং ভবিষ্যতে আক্রমণের পুনরাবৃত্তি না করার অঙ্গীকার করতে হবে।
ট্রাম্প আপাতত যুদ্ধবিরতির দাবিতে রাজি নন এবং ক্ষতিপূরণের দাবিকে তিনি আলোচনার অযোগ্য বলে মনে করছেন। তবে জব্দকৃত সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে ‘শব্দগত পরিবর্তনের’ মাধ্যমে একটি মধ্যপন্থা খুঁজে বের করার সুযোগ রয়েছে বলে কিছু মার্কিন কর্মকর্তা মনে করছেন।
৬ শর্ত মানলে যুদ্ধ বন্ধ করবে ইরান৬ শর্ত মানলে যুদ্ধ বন্ধ করবে ইরান
বর্তমানে ট্রাম্পের প্রতিনিধি দল দুটি মূল প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে—ইরানের পক্ষ থেকে আলোচনার জন্য যোগ্য ব্যক্তি কে এবং কোন দেশ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সবচেয়ে ভালো হবে। আরাঘচিকে ট্রাম্পের উপদেষ্টারা কেবল একটি ‘ফ্যাক্স মেশিন’ হিসেবে দেখছেন, যার হাতে কোনো চুক্তি চূড়ান্ত করার ক্ষমতা নেই। তারা এমন কাউকে খুঁজছেন যিনি ইরানের নীতি নির্ধারণে প্রকৃত ভূমিকা রাখেন।
মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ওমানের ওপর অনাস্থা থাকায় যুক্তরাষ্ট্র কাতারের ওপর নির্ভর করতে চাইছে, কারণ গাজা সংকটে কাতার তাদের কার্যকারিতা প্রমাণ করেছে। কাতার পর্দার আড়ালে সাহায্য করতে আগ্রহী হলেও মূল মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রকাশ্যে আসতে কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে এই কূটনৈতিক তৎপরতা নতুন মোড় নিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সূত্র: অ্যাক্সিওস নিউজ
