বাণিজ্য ডেস্ক :
১৯৭১ সালে বাংলাদেশ যাত্রা শুরু করেছিল নেতিবাচক জিডিপি (-৫.৫ শতাংশ) প্রবৃদ্ধি দিয়ে। যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব হেনরি কিসিঞ্জার তখন বাংলাদেশের গায়ে তকমা লাগিয়ে দিলেন ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’র। এই অপমানজনক মন্তব্য বাংলাদেশের গায়ে ভীষণভাবে লেগেছিল। তবে কিসিঞ্জারকে এখন বাংলাদেশ নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি নিশ্চয়ই লজ্জা পাবেন। বাংলাদেশের তলাবিহীন ঝুড়িতে শুধু তলাই লাগেনি; বরং প্রবৃদ্ধিতে পরিপূর্ণ হয়েছে দেশটি।
বাংলাদেশ এখন বিশ্বের কাছে উন্নয়নের মডেল। বাংলাদেশ যে তড়িৎ অগ্রগতি দিয়ে সবাইকে চমকে দিল, তার পেছনে অনেক অর্থনৈতিক খাতের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ, সোনার বাংলার সোনার কৃষিখাত এবং দ্রুত শিল্পায়ন এর পেছনে নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে। নতুন প্রজন্মের অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাংলাদেশের উন্নয়নের ধারা এখন আরও ত্বরান্বিত করতে পারে ‘সানরাইজ ইন্ডাস্ট্রি’।
‘সানরাইজ ইন্ডাস্ট্রি’ এমন একটি শিল্প, যা খুবই দ্রুত প্রসার লাভ করছে। ১৯৮৩ সালে প্রথমবারের মতো শব্দটি ব্যবহার করা হয়। তখন এটাও আশা করা হয়েছিল যে, এই শব্দটি সামনের দিনগুলোয় আরও জনপ্রিয় হবে। যেসব শিল্প নতুন করে বেড়ে উঠছে এবং সফলতার সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছে, সেগুলোর কথা বলতেই এ চমৎকার শব্দবন্ধনী ব্যাপকভাবে ব্যবহার হয়। এর বিপরীত শব্দ ‘সানসেট ইন্ডাস্ট্রি’। সানসেট ইন্ডাস্ট্রি হলো সেসব শিল্প, যেগুলো তার চূড়ান্ত লাভের সময় পেরিয়েছে।
বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে কোনগুলো ‘সানরাইজ ইন্ডাস্ট্রি’ হতে পারে, তা নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের সাবেক রিসার্চ অ্যানালিস্ট বিদিশা হকের সঙ্গে কথা হয় সময় নিউজের। তিনি বলেন, ‘মূলধন ও কম পুঁজির শিল্পগুলোর বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ‘সানরাইজ ইন্ডাস্ট্রি’ হওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে আমাদের মাথায় রাখতে হবে, শিল্প ছাড়াও সেবা খাত রয়েছে। ছোট ছোট অনেক সেবা খাত রয়েছে। শিল্পের দিক থেকে যদি বলা হয়, তাহলে কিছু কিছু খাত আছে, যেগুলো এখন বেড়ে উঠতে পারে। ফার্মাসিউটিক্যালস, শিপ বিল্ডিং, ফ্রোজেন ফুড౼এগুলো মোটামুটি পুরোনো হয়েছে। তবে এগুলোর বিকাশের জায়গা রয়েছে। এগুলোর পাশাপাশি ফার্নিচার, পাটজাত পণ্য রয়েছে। যেগুলো এখন উদীয়মান শিল্প হতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘সংখ্যায় খুব অল্প হলেও এমন অনেকে আছেন, যারা পাটজাত পণ্য রফতানি করেন। আগে আমরা যেমন পাট বলতে চটের ব্যাগ বুঝতাম, এখন আর বিষয়টা সেখানে সীমাবদ্ধ নেই। এটার সঙ্গে আধুনিকতার ছোঁয়া যুক্ত হয়েছে। তারা পাটজাত জিনিস থেকে জুতাও তৈরি করছে। এই ধরনের হস্তশিল্প বা কুটিরশিল্পের একটা বিশাল বাজার আছে।’ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ‘সেবাখাত’ বড় ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, “সেবাখাতের মধ্যে আমি যেটা বলতে চাইছি, যেমন ঘরে বসে যেগুলো করা যায়। এর প্রথমেই বলতে হয়, ফ্রিল্যান্স। ভারতে কিন্তু ফ্রিল্যান্সিংয়ের বিশাল বাজার রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশেও এর বাজার তৈরি হচ্ছে। আমরা এ ধরনের বিষয়কে ‘প্ল্যাটফর্ম ইকোনমি’ বলি। ই-কমার্সভিত্তিক অনেক সার্ভিসই আছে এখন, তবে ফ্রিল্যান্সিংয়ে আরও ‘অ্যাডভান্স স্কিল বেজড’ কিছু কাজ আছে। যেখানে আপনি ঘরে বসে বিভিন্ন ডিজাইন বা সফটওয়্যার নির্মাণ থেকে শুরু করে এডিটিংয়ের কাজ করতে পারেন। ভারতে কিন্তু এমনটা হচ্ছে।”
তবে প্ল্যাটফর্ম ইকোনমি শিল্পের একটি দুর্বলতাও তুলে ধরেন তিনি। বলেন, “একটা সমস্যা এই যে কাজগুলো বড় আকারের কিছু নয়, ক্ষেত্রটা ছোট। এটা ছোট পরিসরে হয়ে থাকে।
বাংলাদেশে খুব বেশি একটা প্রচলিত নয়; কিন্তু প্রচণ্ড সম্ভাবনাময় একটি শিল্প হলো ‘কেয়ার ইকোনমি’। কেয়ার ইকোনমি মূলত নবজাতক থেকে শুরু করে শিশুদের যত্ন, নতুন বাবা-মায়ের জন্য প্রযুক্তি, শিক্ষা কর্মসূচি, গৃহস্থালি কাজকর্ম, বয়স্কদের সেবা করার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি শাখা।”
বিদিশা হক বলেন, ‘জাপানের মতো দেশে বয়স্কদের সংখ্যা বেশি। সেখানে কিছুটা ভাষা শেখা হলে এবং তার সঙ্গে কিছু দক্ষতা থাকলে আমরা আমাদের মেয়েদের বা ছেলেদের সেখানে পাঠাতে পারি। তাদের কিন্তু দেশেও কাজে লাগানো যেতে পারে। এটাকে পেশায় রূপ দেয়া জরুরি। এর চাহিদা যেমন আছে, তেমনি সরবরাহও সম্ভব। আমাদের দেশে যে নারীরা রেমিট্যান্স আনেন, তাদের আরেকটু শিক্ষাগত যোগ্যতা বাড়িয়ে এবং আরও প্রশিক্ষণ দিয়ে যদি জাপানের মতো দেশগুলোতে পাঠানো যায়, তাহলে তাদের জন্য পৃথক কর্মসংস্থান তৈরি করা যাবে।’
তিনি বলেন, একটা বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেটা হলো বিপণন। নেদারল্যান্ডস অ্যাম্বাসি পাবনার একটা অঞ্চলে নারীদের কাছ থেকে বেত থেকে বানানো বিভিন্ন তৈজসপত্র বিক্রি করে। এখানে তাদের দক্ষতা আছে কিন্তু এর সঙ্গে আরও দরকার সুনির্দিষ্ট মান এবং বিপণন ব্যবস্থা। এখানে যেমন নেদারল্যান্ডস অ্যাম্বাসির উদ্যোগে তাদের ব্যবসা দাঁড়িয়ে গেছে। আমি একজনের কথা বলেছি, যিনি আমাকে বলেছেন পিকেএসএফ (পল্লী কর্মসংস্থান) তাদের অনেক সাহায্য করেছে। এমন দু-একটা ঘটনা থাকলেও আরও উদাহরণ তৈরি করতে হবে। অনেকে নিজস্ব উদ্যোগে হয়তো করছে। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে একটা সংযোগের পথ তৈরি করা প্রয়োজন। ফরেন ডাইরেক্টরি ইনভেস্টমেন্ট জরুরি, কিন্তু সেটার সঙ্গে দেশীয় এসব ছোটখাটো শিল্পে সরকারের প্রণোদনা থাকলে অনেক কর্মসংস্থান হবে।
সম্প্রতি বিশ্বজুড়ে ইলেকট্রিক গাড়ির প্রচলন বেড়েছে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও ইলেকট্রিক ব্যাটারিচালিত গাড়ির বাজার বেড়েছে। এ ছাড়া গণপরিবহনেও এসেছে পরিবর্তন। তবে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় এখনো মেশিনচালিত রিকশা তাড়াতে হিমশিম খাচ্ছে পুলিশ প্রশাসন। বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত সংবাদে দেখা যায় যে বিভিন্ন প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ব্যাটারিচালিত বা সাশ্রয়ী গাড়ির মডেল বানালেও তা কখনোই আলোর মুখ দেখছে না। আলোর মুখ দেখছে না শত শত রোবট-স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রপাতির প্রজেক্টও।
কেন এমন ঘটছে౼সেই প্রশ্নের উত্তরে বিদিশা হক বলেন, ভারতে বাইরে থেকে পড়াশোনা করে ফেরত আসছে এবং দক্ষতাসম্পন্ন তরুণ উদ্যোক্তা সেখানে আছে। ভারতে তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ সহায়তার ব্যবস্থাও রয়েছে। আমাদের দেশের সঙ্গে পার্থক্য হলো আমাদের উচ্চতর দক্ষতাসম্পন্ন মানুষ আর দেশে ফেরত আসছে না। ভারতে কিন্তু অনেকেই ফেরত আসে। অনেক ইন্ডাস্ট্রি সেখানে তৈরি হওয়া সম্ভব। যেকোনো ধরনের ইন্ডাস্ট্রির জন্য যেসব ট্রেনিং এবং প্রণোদনা দরকার, সেটার অভাব আছে। তা ছাড়া আমাদের এখানে কোনো কাজ করতে ব্যুরোক্রেটিক ঝামেলা অনেক বেশি। এগুলোতে নতুন উদ্যোক্তাদের অনেক ঝামেলা পোহাতে হয়।
গবেষণা সংস্থা বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) গবেষক ড. কাজী ইকবাল বলেন, ‘সবাই ভাবে বাংলাদেশের শুধু গার্মেন্টস রেমিট্যান্সের গল্পটাই আছে। সেখান থেকে আমরা আরও দূরে যাত্রা শুরু করেছি। এখন আমরা একই সঙ্গে এটাও বলি যে বাংলাদেশের অগ্রগতিতে রয়েছে আরএফএল-ওয়ালটনের গল্পও। রফতানির পাশাপাশি দেশে পণ্যের চাহিদা বাড়ার যে হার, তার একটা বিশাল ভূমিকা রয়েছে আমাদের অর্থনীতিতে। ফলে আমাদের ইলেকট্রনিকস এবং গৃহস্থালি ব্যবহার্য জিনিসের চাহিদা ব্যাপক হারে বাড়বে।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের গ্রামীণ বাজারে হোম এপ্লায়েন্স (টিভি, ফ্রিজ প্রভৃতি) খুব অল্পই এগিয়েছে। গ্রামের অর্থনীতিতে তাদের আয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ইলেকট্রনিকস সেক্টরে বড় পরিবর্তন আসবে। সেখানে আরও বড় বাজার তৈরি হবে। বাংলাদেশ ভবিষ্যৎ রয়েছে এই ইলেকট্রনিক সেক্টরে। এমন একটা সময় আসবে যখন নারী-পুরুষ দুজনই ঘরের বাইরে কাজ করবে। তখন প্রসেসড ফুডের চাহিদাও বাড়বে। এতে কৃষিশিল্প আরও উন্নত হবে এবং এর পরিসর বাড়বে।
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা যদি আরও দূরভবিষ্যতের কথা চিন্তা করি, তাহলে আইসি-চিপ হতে পারে আমাদের অর্থনীতির অন্যতম বড় একটি প্রভাবক। বিশ্বব্যাপীই আইসি চিপের চাহিদা রয়েছে। ওয়ালটন এবং এসিআই ইতোমধ্যে এগুলো তৈরি করছে। এখানে আমাদের ইঞ্জিনিয়ার এবং উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন মানুষ কাজ করতে পারেন এবং অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে আইসিচিপ।’
লন্ডনভিত্তিক অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. এম আবু ইউসুফ বাংলাদেশে বাণিজ্যে আগ্রহী কর্মসংস্থান তৈরি করা কোম্পানিগুলোকে ট্যাক্স হলিডে ফিসক্যাল এবং নন ফিসক্যাল সাহায্যের কথা বলেন। এতে আমাদের তরুণ জনপদের কর্মসংস্থান হবে এবং বিদেশি কোম্পানিগুলোও আমাদের ব্যাপারে আরও আগ্রহী হয়ে উঠবে।
তিনি বলেন, উন্নয়নের ফলে যে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হওয়ার কথা, তা এখনো নেহাত কম। আমাদের এই দুই বিষয়ের মধ্যে মেলবন্ধন তৈরি করতে হবে। আমাদের যে গ্র্যাজুয়েটরা আছে, তাদের যদি কাজে লাগানো না যায়, তাহলে সমাজে নানা ধরনের অস্থিতিশীলতা তৈরি হবে। আমাদের দেশের অর্থনীতিতে এ কারণে সানরাইজ ইন্ডাস্ট্রিকে সামনে নিয়ে আসতে হবে।
নীতি সহায়তার কারণে অনেক বিদেশি কোম্পানি আমাদের দেশে তাদের বাণিজ্য চালিয়ে যেতে পারে না। এ কারণে তাদের নীতি সহায়তা দিতে হবে বলেও মনে করেন তিনি। তিনি বলেন, উন্নয়নের অগ্রগতির ধারাবাহিকতা সুষ্ঠু পরিবেশ এবং সহজ নীতি একান্ত দরকার।
