নিজস্ব প্রতিনিধি :
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৯৮ সালে সাতক্ষীরায় ভূমিহীনদের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তার কিছুটা বাস্তবায়ন হলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় তা পুরোপুরি এখনও বাস্তবায়িত হয়নি। প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি সত্বেও দীর্ঘ ২৪ বছরেও এখনও অনেক ভূমিহীন জমি পাননি ,যাদের জমি দেওয়া হয়েছে তাদের জমির মিউটেশন করছে না প্রশাসন। শহীদ জায়েদার আত্মত্যাগ ও সাতক্ষীরার খাসজমির আন্দোলন এবং বর্তমান প্রেক্ষাপট শীর্ষক শনিবার এক গোল টেবিল বৈঠকে বক্তার এসব কথা বলেন।
সাতক্ষীরা খামারবাড়ির মিলনায়তনে উত্তরণের আমার প্রকল্পের সহযোগিতায় কেন্দ্রীয় ভুমি কমিটি এ বৈঠকের আয়োজন করে। এড.আবুল কালাম আজাদের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোঃ নজরুল ইসলাম। গোল টেবিল বৈঠকে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন ভূমিহীন আন্দোলনের নেতা ও সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি অধ্যক্ষ আবু আহমেদ, অধ্যক্ষ আব্দুল হামিদ, শিক্ষাবিদ কিশোরী মোহন সরকার, অধ্যক্ষ আশেক ই এলাহী প্রমুখ। মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন জেলা ভূমি কমিটির সভাপতি মোঃ আনিসুর রহিম। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন উত্তরণের প্রকল্প পরিচালক মনিরুজ্জামান জমাদ্দার।
গোল টেবিল বৈঠকে বক্তারা বলেন, ১৯৯৮ সালের ২৭ জুলাই দেবহাটা কালীগজ্ঞের বাবুরাবাদে খাস জমিতে ভূমিহীনদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে ভূমিদস্যূদের ইঙ্গিতে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন জাহেদা খাতুন নামে এক ভূমিহীন গৃহবধূ। এতে করে ভূমিহীনরা ফুসে উঠে। সমস্ত সাতক্ষীরা ভূমিহীন আন্দোলনে উত্তাল হয়ে উঠে। এই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সব কয়টি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা সাতক্ষীরায় এসে ভূমিহীনদের আন্দোলনের সাথে একাত্মতা ঘোষনা করে তাদের দাবী মেনেনেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি আহবান জানান।
ভূমিহীনদের দাবীর প্রেক্ষিতে তৎকালীন জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারকে সাতক্ষীরা থেকে প্রত্যাহার করা হয় এবং তৎকালীন জেলা আওয়ামীলীগের কমিটি বিলুপ্ত করাহয়। এরপর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেবহাটার দেবী শহর মাঠে এসে ভূমিহীনদের পাশে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সেই প্রতিশ্রুতির কিছু বাস্তবায়ন হয়েছে।
আবার আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় কিছু বাস্তবায়ন হয়নি। ১৫২৭ একর খাস জমি প্রভাবশালী ভূমিদস্যদের নিয়ন্ত্রণে আছে। সেগুলো উদ্ধার করে প্রকৃত ভূমিহীনদের মাঝে বন্দোবস্ত প্রদানের উদ্যোগ নিতে হবে। কিছু সমস্যা আছে সেগুলো সমাধান করতে হবে। কোন ভূমি কোন অবস্থায় আছে সেটার তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করতে হবে। কোন ভূমিহীন কী সমস্যায় আছে, কীভাবে জমির নাম পত্তন করা যায়, যিনি দলিল পাননি তার দলিল হস্তান্তর করা যায়, কোন খাস জমি ভূমিদস্যুরা মিথ্যা মামলা করে তাদের দখলে রাখতে চায় সেগুলো চিহ্নিত করতে হবে।
বক্তারা আরো বলেন সেই সময় যিনি প্রধানমন্ত্রী ছিলেন আজও তিনি প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রীর কাছে গিয়ে এই সমস্যার সমাধান চাওয়া যেতে পারে। ভূমিহীন আন্দোলনের সাথে প্রথমে যারা যুক্ত ছিলেন তাদের অনেক মারা গেছেন। আজ যারা নেতৃত্ব দিচ্ছেন তাদের নেতৃত্বে সরকারী প্রক্রিয়ায় বাকী খাসজমি প্রকৃত ভূমিহীনদের মাঝে বন্ঠন হবে এটা প্রত্যাশা করেন বক্তারা।
গোল টেবিল বৈঠকের বক্তারা বলেন, ১৯৯৮ সালের আন্দোলনের পূর্বে দেবহাটা-কালিগঞ্জের খাস জমিতে বসবাসকারীদের অধিকাংশই দরিদ্রসীমার নিচের মানুষ। ঐ সময় ভূমিহীন গণনাকালে ঐ এলাকায় বসবাসকারদের মধ্যে ভিক্ষাবৃত্তি করে জীবিকা নির্বাহ করতো এমন পরিবারের সংখ্যা ছিল কমপক্ষে ৭৬টি। কিন্তু জমি বন্দোবস্ত পাওয়ার পর এখন তাদের অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। পরিবার প্রতি বন্দোবস্তকৃত প্রায় এক একর জমির মধ্যে বাড়ি-ঘর ছাড়া বাকি জমিতে ক্ষেত খামার ও মাছ চাষ করে তারা প্রত্যেকেই এখন স্বাবলম্বি। অনেকের ছেলে মেয়েরা লেখাপড়া শিখে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে।
ভূমিদস্যুরা ঐ জমিতে যে পরিমান ফসল ফলাতো ভূমিহীনরা এখন তার কয়েকগুন বেশি ফসল ফলিয়ে জাতীয় উন্নয়নে অধিকতর ভূমিকা রাখছে। বক্তারা দেবহাটা-কালিগঞ্জের খাসজমিতে বসবাসকারীদের মধ্যে যারা জমি পেয়েছে তাদের জমির নামপত্তন করা এবং যারা এখনো জমি পাননি তাদেরকে অতিদ্রুত জমি দেওয়ার আহবান জানান। এছাড়া জেলার অন্যান্য এলাকার খাসজমি উদ্ধার করে তা ভূমিহীনদের মাঝে বন্দোবস্ত প্রদানে কার্যকর ভূমিকা রাখতে সংশ্লিষ্ঠদের প্রতি আহবান জানান। গোল টেবিল বৈঠক শেষে একটি র্যালি অনুষ্ঠিত হয়।
