আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলি বিমান হামলায় ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এক সংকটময় মোড়ে দাঁড়িয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আইআরজিসি-কে অস্ত্র সমর্পণের বিনিময়ে দায়মুক্তির প্রস্তাব দিলেও এই শক্তিশালী বাহিনী তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। গত এক মাসে মার্কিন-ইসরায়েলি ব্যাপক বোমাবর্ষণ এবং শীর্ষ নেতৃত্বের বড় অংশ হারানো সত্ত্বেও তারা পরাজয় মেনে নেওয়ার কোনো লক্ষণ দেখাচ্ছে না।
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্থলসেনা মোতায়েনের প্রেক্ষাপটে আইআরজিসি-র প্রতিরোধ সক্ষমতা বোঝা জরুরি। ইতিহাস বলছে, অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি বা অভ্যন্তরীণ ফাটল সত্ত্বেও আইআরজিসি যেকোনো বিদেশি আগ্রাসন মোকাবিলায় অত্যন্ত কঠোর ও অনড় থাকবে। প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার সদস্য এবং ‘বাসিজ’ নামক আধাসামরিক বাহিনীর ৪ লাখ ৫০ হাজার রিজার্ভ সদস্য নিয়ে গঠিত এই বাহিনী ইরানের রাজনীতি, গোয়েন্দা সংস্থা এবং অর্থনীতির একটি বিশাল অংশ নিয়ন্ত্রণ করে।
আইআরজিসি-র এই আপসহীন মনোভাবের গোড়াপত্তন হয়েছিল ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের সময়। তখন এটি ছিল কেবল আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির আদর্শে বিশ্বাসী ছাত্রদের নিয়ে গঠিত একটি অনিয়মিত রাজপথের মিলিশিয়া। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল নতুন বিপ্লবী সরকারকে রক্ষা করা এবং তৎকালীন রাজতন্ত্রের অনুগত নিয়মিত সেনাবাহিনী বা ‘আর্তেশ’-এর সম্ভাব্য পাল্টা অভ্যুত্থান নস্যাৎ করা।
খুব দ্রুতই এই বাহিনী ইরানের সর্বোচ্চ নেতার একনিষ্ঠ রক্ষীবাহিনী বা ‘পাসদারান-এ ইনকিলাব’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। প্রতিষ্ঠার শুরুর দিনগুলোতে তারা কেবল অভ্যন্তরীণ শত্রুদের সাথেই লড়েনি, বরং ধর্মনিরপেক্ষ বামপন্থী এবং প্রতিদ্বন্দ্বী ইসলামি মিলিশিয়াদের বিরুদ্ধেও রাজপথে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল। এই লড়াইগুলো তাদের একটি সুসংগঠিত ও আদর্শিক বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলে।
১৯৮০ সালে ইরাকের ইরান আক্রমণের পর আইআরজিসি একটি সম্মুখ সমর শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। নিয়মিত সেনাবাহিনীর সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তারা ১৯৮২ সালের মধ্যে সাদ্দাম হোসেনের বাহিনীকে বিতাড়িত করতে সক্ষম হয়। এই যুদ্ধের অভিজ্ঞতা আইআরজিসি-র বর্তমান কমান্ডারদের মনে গভীরভাবে গেঁথে আছে, যারা তখন তরুণ সৈনিক হিসেবে কাজ করেছিলেন। বিশেষ করে পশ্চিমাদের নীরবতায় ইরাকের রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের ভয়াবহতা তারা সরাসরি প্রত্যক্ষ করেছেন।
কেবল বিদেশি আক্রমণ নয়, আইআরজিসি একটি শক্তিশালী কাউন্টার-ইনসারজেন্সি ফোর্স হিসেবেও নিজেদের প্রমাণ করেছে। আশির দশকে উত্তর-পশ্চিমের কুর্দি বিদ্রোহ থেকে শুরু করে ২০০০-এর দশকে দক্ষিণ-পূর্বের বেলুচ বিদ্রোহ—সবই তারা কঠোরভাবে দমন করেছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কুর্দিদের উসকে দেওয়ার যে চেষ্টা করছেন, তা আইআরজিসি কমান্ডারদের আরও বেশি ক্ষুব্ধ করে তুলবে কারণ তারা দশকের পর দশক ধরে এসব গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াই করছে।
আঞ্চলিক মিত্র বা প্রক্সি বাহিনীর মাধ্যমে আইআরজিসি দীর্ঘ সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ছায়াযুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে। ১৯৮২ সালে লেবাননে হিজবুল্লাহ গঠনে আইআরজিসি-র বৈদেশিক শাখা ‘কুদস ফোর্স’ মুখ্য ভূমিকা পালন করে। দীর্ঘ ১৮ বছরের গেরিলা যুদ্ধের ফলে ২০০০ সালে ইসরায়েলি বাহিনী দক্ষিণ লেবানন ছাড়তে বাধ্য হয়, যা ইসরায়েলের জন্য একটি বড় সামরিক ব্যর্থতা হিসেবে গণ্য হয়।
একই কৌশলের পুনরাবৃত্তি দেখা যায় ২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন অভিযানের পর। কুদস ফোর্স সমর্থিত শিয়া মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলো আইইডি বা উন্নত বিস্ফোরক ব্যবহার করে মার্কিন বাহিনীকে নাজেহাল করে তোলে। শেষ পর্যন্ত ২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্র এক প্রকার বাধ্য হয়েই ইরাক ত্যাগ করে। এই দীর্ঘমেয়াদী এবং ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধের (War of Attrition) কৌশলগুলো আইআরজিসি-র কাছে অত্যন্ত পরিচিত এবং কার্যকর একটি অস্ত্র।
ইতিহাস বলছে, সরাসরি এবং উচ্চ-তীব্রতার স্থল যুদ্ধে আইআরজিসি হয়তো মার্কিন বাহিনীকে তাৎক্ষণিকভাবে রুখতে পারবে না। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র যদি তাদের লক্ষ্য অর্জনে দীর্ঘ সময় নেয়, তবে তারা আবারও একটি অন্তহীন গেরিলা যুদ্ধের মুখে পড়বে। আইআরজিসি-র সুপ্রশিক্ষিত গেরিলা কৌশলগুলো তখন দখলদার বাহিনীকে ক্লান্ত ও বিপর্যস্ত করে তোলার জন্য ব্যাপকভাবে প্রয়োগ করা হবে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ইতিহাসও এই সংঘাতকে উসকে দিচ্ছে। ২০০১ সালে নাইন-ইলেভেনের পর তালেবান দমনে ইরান সংক্ষিপ্ত সহযোগিতা করলেও ২০০২ সালে জর্জ ডব্লিউ বুশ ইরানকে ‘অক্ষশক্তি’ হিসেবে ঘোষণা করেন। এর ফলে ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সংস্কারপন্থীদের পরাজয় ঘটে এবং মাহমুদ আহমাদিনেজাদের মতো কট্টরপন্থীদের উত্থান হয়, যারা পরমাণু কর্মসূচি ও আইআরজিসি-র ক্ষমতা বৃদ্ধিতে বিনিয়োগ করেন।
আইআরজিসি-র দৃষ্টিতে, আশির দশক থেকেই যুক্তরাষ্ট্র প্রক্সি বাহিনী বা অর্থনৈতিক যুদ্ধের মাধ্যমে ইরানকে দুর্বল করার চেষ্টা করছে। ২০১৯ সালে আইআরজিসি-র ঘাঁটিতে আইসিসের হামলার পেছনেও তারা মার্কিন ও ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থার হাত দেখেছিল। তাদের কাছে বর্তমান যুদ্ধটি ১৯৭৯ সালে শুরু হওয়া একটি দীর্ঘস্থায়ী বৈশ্বিক লড়াইয়েরই অংশ, যেখানে তারা নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই করছে।
গত এক মাসের বিমান হামলায় আইআরজিসি দুর্বল হলেও তাদের প্রাতিষ্ঠানিক ঐক্য এখনো অটুট। বাহিনীর কর্মকর্তাদের মধ্যে একটি গভীর ‘কর্পোরেট আইডেন্টিটি’ কাজ করে, যা তাদের শীর্ষ নেতৃত্ব নিহত হওয়ার পরও ঐক্যবদ্ধ থাকতে সাহায্য করে। খামেনির মৃত্যুর পর তারা তাঁর ছেলে মোজতাবাকে সমর্থন দিয়ে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রেখেছে। তারা জানে, বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার পতন ঘটলে তাদের বিশেষ মর্যাদা চিরতরে হারিয়ে যাবে।
আইআরজিসি কেবল একটি সামরিক বাহিনী নয়, বরং এটি একটি বিশাল অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য। নির্মাণ শিল্প থেকে শুরু করে গণমাধ্যম—ইরানের অর্থনীতির অন্তত ২০ শতাংশ এই বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। অনেক নেতা এই নেটওয়ার্ক থেকে ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হয়েছেন। ফলে নতুন কোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থায় বিচারের মুখোমুখি হওয়ার ভয়ে তারা কোনো অবস্থাতেই আত্মসমর্পণ করবে না।
চূড়ান্তভাবে বলা যায়, আইআরজিসি ইরানের ভেতরে একটি ‘ডিপ স্টেট’ বা রাষ্ট্রের ভেতরে রাষ্ট্র হিসেবে কাজ করে। এটি একটি স্বতন্ত্র এবং স্বায়ত্তশাসিত সামরিক প্রতিষ্ঠান যা খামেনির অবর্তমানেও নিজেদের ক্ষমতা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং বর্তমান সংঘাতের গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয় যে, আইআরজিসি সহজে নতি স্বীকার করবে না এবং শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়াই চালিয়ে যাবে।
