হোম অর্থ ও বাণিজ্য ভরা মৌসুমেও কেন ইলিশের দামে আগুন

বাণিজ্য ডেস্ক :

ইলিশের ভরা মৌসুম চললেও বাজারে ইলিশের দামে আগুন। জেলেদের জালে ধরা পড়ছে বিপুল পরিমাণ ইলিশ, বাজারেও সরবরাহ প্রচুর, তারপরও মাঝারি সাইজের একটি ইলিশের দাম হাজার টাকার ওপর। এর মধ্যেই শেষ হয়ে আসছে ইলিশ ধরার মৌসুম। আগামী ৭ অক্টোবর থেকে ২২ দিনের জন্য সারা দেশে বন্ধ হচ্ছে সব ধরনের ইলিশ ধরা ও বেচাকেনা। তাই আপাতত ইলিশের দাম কমার তেমন সম্ভাবনা নেই বলে জানাচ্ছেন ইলিশ সংশ্লিষ্ট জেলে ও আড়তদাররা। গত কয়েক বছরের মধ্যে এবারই সবচেয়ে চড়া ইলিশের দাম। প্রশ্ন উঠছে, ইলিশ নিয়ে এবার কেন এত হাহাকার ইলিশপ্রেমীদের মাঝে। পর্যাপ্ত সরবরাহ সত্ত্বেও দাম কেন এত চড়া।

ইলিশের আড়ত চাঁদপুরে চড়া ইলিশের দাম
বাংলাদেশে ইলিশ মাছের সবচেয়ে বড় পাইকারি আড়ত চাঁদপুরে। সেখানকার দামকেই সাধারণত দেশে ইলিশের দামের স্ট্যান্ডার্ড হিসেবে ধরা হয়। চাঁদপুরে বর্তমানে ৭০০ থেকে ৮০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ৩৪ থেকে ৩৬ হাজার টাকা মণ। সে হিসেবে এই সাইজের মাছের প্রতি কেজির দাম পড়ে ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা। আর যেসব ইলিশের ওজন ৬০০ থেকে ৭০০ গ্রাম, সেগুলোর মণ ২৮ থেকে ৩০ হাজার টাকা। এগুলোর প্রতি কেজির দাম পড়ে ৭০০ থেকে সাড়ে ৭০০ টাকা। তবে চাঁদপুরের আড়তে এক কেজি সাইজের ইলিশের দাম ও চাহিদা সব থেকে বেশি। সেখানে এক কেজি ও তার চেয়ে একটু বেশি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ৪২ থেকে ৪৪ হাজার টাকা মণে। তাতে প্রতি কেজি ইলিশের দাম পড়ছে এক হাজার টাকার ওপর। অপরদিকে দেড় কেজির ইলিশের দাম পড়ছে ৫২ হাজার টাকা মণ।

ইলিশের দাম বৃদ্ধির জন্য ভারতে রফতানিই কি দায়ী
এবার ইলিশের দাম বৃদ্ধির জন্য অনেকে দায়ী করেছেন ভারতে ইলিশ রফতানির সরকারি সিদ্ধান্তকে। তাদের মতে, ভারতে রফতানির কারণে দেশের বাজারে চড়া ইলিশের দাম। অথচ ভারতে মাত্র আড়াই হাজার টন ইলিশ রফতানির অনুমতি দিয়েছে সরকার। যা মোট ইলিশের উৎপাদনের তুলনায় খুবই নগন্য। গত বছর বাংলাদেশে ইলিশ ধরা পড়েছে ৬ লাখ টনেরও বেশি। এবার তা আরও বাড়ার প্রত্যাশা মৎস্য সম্পদ বিভাগের। এ পরিস্থিতিতে ভারতে রফতানির কারণে দেশের বাজারে ইলিশের দাম বৃদ্ধির বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়।

কলকাতার বাজারে কি ইলিশের দাম আসলেই কম
কলকাতার বাজারগুলোতে নাকি বাংলাদেশ থেকে যাওয়া ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ঢাকার বাজারের থেকে কম দামে। তবে ইলিশ রফতানিকারকরা বলছেন, পত্রপত্রিকায় যেভাবে দেখানো হচ্ছে এতটা সরল নয় ইলিশের দামের হিসাবটি। বর্তমানে কলকাতার বাজারে এক কেজি সাইজের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ১২শ’ থেকে ১৪শ’ রুপি বা বাংলাদেশি টাকায় ১৪শ’ থেকে ১৬শ’ টাকায়। আবার ঢাকার খুচরা বাজারে বর্তমানে এক কেজি বা তার বেশি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি কমপক্ষে ১২শ’ থেকে ১৪শ’ টাকায়। এদিকে আবার কলকাতার বাজারে বাংলাদেশের নাম করে বিক্রি হচ্ছে গুজরাটের ইলিশ। অবশ্য এগুলো দামেও কিছুটা সস্তা।

ইলিশের আদালত দর্শন
এদিকে ভরা মৌসুমে ইলিশের দুর্মূল্যের বিষয়টি মেনে নিতে পারছেন না অনেক ইলিশপ্রেমী। বিষয়টি গড়িয়েছে আদালত পর্যন্ত। দাম বৃদ্ধির জন্য ভারতে ইলিশ রফতানির সিদ্ধান্তকে দুষছেন তারা। তাদের মতে, ভারতে ইলিশ রফতানির কারণেই দেশের বাজারে চড়ে গেছে দাম। ভারতে ইলিশ রফতানি বন্ধে সরকারকে সম্প্রতি আইনি নোটিশ দিয়েছেন মোহাম্মদ মাহমুদুল হাসান নামের এক আইনজীবী। নোটিশের কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ভারতে ইলিশ রফতানি করার কারণে বাংলাদেশে ইলিশের দাম বেড়ে গেছে। বাংলাদেশের মানুষ ইলিশ খেতে পারছেন না। বাংলাদেশের রফতানি নীতি অনুযায়ী ইলিশ রফতানি উন্মুক্ত নয়। দেশের মানুষ যেখানে ইলিশ খেতে পারছে না দামের কারণে সেখানে রফতানি গ্রহণযোগ্য নয়। তাই স্থায়ীভাবে ভারতে ইলিশ রফতানি বন্ধে ব্যবস্থা নিতে ওই নোটিশ পাঠানো হয়েছে। এ বিষয়ে সাত দিনের মধ্যে ব্যবস্থা না নেয়া হলে উচ্চ আদালতে রিট করার কথা জানান তিনি।

কত ইলিশ রফতানি হচ্ছে ভারতে
গত ৪ সেপ্টেম্বর থেকে সরকার ভারতে ইলিশ রফতানির অনুমতি দেয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ৪৯টি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে দুই হাজার ৪৫০ মেট্রিক টন ইলিশ রফতানির অনুমোদন দিয়েছে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠান ৫০ মেট্রিক টন করে ইলিশ রফতানি করতে পারবে। ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে তাদের রফতানি করতে হবে ইলিশ।

বাংলাদেশ থেকে ভারতে প্রতি কেজি ইলিশ রফতানিতে দাম ধরা হয় গড়ে দশ ডলার। গত রোববার থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক রফতানির ক্ষেত্রে এক ডলারের দাম ৯৯ টাকা করেছে। আবার খোলাবাজারে ডলারের দর ১০৭ টাকা। সে হিসেবে প্রতি কেজি ইলিশ রফতানি হচ্ছে গড়ে ৯৯০ টাকা থেকে ১ হাজার সত্তর টাকার মধ্যে। রফতানিকারকরা বলছেন, কলকাতায় রফতানির ক্ষেত্রে এক চালানে সব ইলিশই এক সাইজের বা এক কেজির সাইজের পাঠানো হয় না। এক মণে এক কেজির ইলিশ সাধারণত দশটির বেশি থাকে না। চালানের চার ভাগের তিন ভাগ ইলিশের সাইজই থাকে এক কেজির নিচে। রফতানিকারকরা ভিন্ন ভিন্ন সাইজের ইলিশ ভিন্ন ভিন্ন দরে কিনলেও পাঠানোর সময় ১০ ডলার কেজি হিসেবেই পাঠান। এভাবে রফতানি মূল্যের সাথে বাজারের দর অ্যাডজাস্ট করে নেন তারা।

গভীর সমুদ্র থেকে ধরা ইলিশে খরচ বেশি জেলেদের
এ বছর ইলিশের বিচরণ ক্ষেত্র পরিবর্তনের কথা জানিয়েছেন ইলিশ শিকারি জেলেরা। উপকূলের বদলে ইলিশ মিলছে গভীর সমুদ্রে। তারা বলছেন আগে যেখানে উপকূলে জাল ফেললেই তাদের নৌকার গলুই ভরে উঠতো ইলিশে। সেখানে এখন ইলিশ ধরতে তাদের যেতে হয় গভীর সমুদ্রে। সমুদ্রে থাকতেও হচ্ছে বেশি সময়। ফলে বেড়ে যাচ্ছে মাছ ধরার নৌকার জ্বালানি, মাল্লাদের মজুরিসহ অন্যান্য খরচ। সমুদ্রে মাছ ধরার ট্রলারগুলোর ইঞ্জিনগুলো চলে ডিজেলে। সম্প্রতি দেশে ডিজেলসহ জ্বালানির দাম বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া বেশি সময় সমুদ্রে থাকতে হওয়ায় মজুরিও বেড়ে যাচ্ছে মাল্লাদের। এই অতিরিক্ত খরচ যোগ হচ্ছে ভোক্তা পর্যায়ে ইলিশের দামে।

সম্পর্কিত পোস্ট

মতামত দিন