হোম ফিচার প্রসঙ্গ : ভোমরা সিএন্ডএফ নির্বাচন। চেনা পুলিশ কেন হলো অচেনা?

প্রসঙ্গ : ভোমরা সিএন্ডএফ নির্বাচন। চেনা পুলিশ কেন হলো অচেনা?

কর্তৃক Editor
০ মন্তব্য 1108 ভিউজ

মন্তব্য প্রতিবেদন,

রামকৃষ্ণ চক্রবর্তী
—————-

দীর্ঘ ছাব্বিশ বছর সাংবাদিকতা পেশায় নিয়োজিত রয়েছি। ৯ বছর আগে ভোমরা সি এন্ড এফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যপদ লাভ করেছি। এর পাশাপাশি আমদানি ব্যবসায়ী জড়িয়ে পড়ি। ব্যবসা বাণিজ্যের মধ্যে কিছুটা আর্থিক স্বচ্ছলতার সন্ধান পেয়েছি। ইতোপূর্বে সিএন্ডএফ এর কমিটি নিয়ে তেমন আগ্রহ ছিল না। তারপরও সিএন্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের কার্যনির্বাহী কমিটিতে যুক্ত ছিলাম। নিজের পদের জন্য কখনও কোন নেতার কাছে ধর্ণা ও ধরিনি। কিন্তু এবারের প্রেক্ষাপট ছিল ভিন্ন রকম। ২০২১ সালের জুন জুলাই মাস থেকে ভোমরা বন্দর এর বিপরীতে ভারতের ঘোজাডাঙ্গা বেসরকারি পার্কিং ওয়ার্ডগুলোতে সিরিয়ালের নামে চাঁদাবাজি শুরু হয়। যেহেতু আমদানি ব্যবসার সাথে জড়িত, সে কারণে সিরিয়ালের নামে চাঁদাবাজির কারণে আমার মত অসংখ্য ব্যবসায়ী আর্থিক ক্ষতির সম্মুখিন হতে থাকে।

তত্কালীন সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান নাসিমকে বলেছিলাম এ ব্যাপারে প্রতিবাদ করতে। তিনি জেলা প্রশাসকের কাছে আমদানিকারক ব্যবসায়ী সংগঠনের আবেদন ফরওয়ার্ডিং করে দায়িত্ব শেষ করেছিলেন।

এরপর আইন-আদালত শেষে এজাজ আহমেদ স্বপন এর নেতৃত্বাধীন এডহক কমিটির সদস্যপদে এখনো দায়িত্ব পালন করে চলেছি। জানুয়ারি মাসের শেষের দিকে এজাজ আহমেদ স্বপন এর নেতৃত্বে সিরিয়ালের নামে চাঁদাবাজি বন্ধের দাবিতে আন্দোলন শুরু করি। কিছুটা সফলতা আসে। কিন্তু মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহ পর থেকে আবারো সিরিয়ালের নামে চাঁদাবাজি শুরু হয়। পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট আহবায়ক কমিটির ৪ জন সদস্য যুক্ত স্বাক্ষরের ঘোজাডাঙ্গা সিএন্ডএফ এজেন্ট এসোসিয়েশনের সভাপতি ও সম্পাদকের কাছে গত ৩১ মার্চ সিরিয়ালের নামে চাঁদাবাজি বন্ধের দাবি জানিয়ে চিঠি পাঠায়। অন্যথায় সিরিয়াল বহির্ভূত আমদানিজাত পণ্যবাহী ট্রাক আটক করে জরিমানা আদায়ের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করি। আমদানিকারকদের অনুরোধে গত ৩ এপ্রিল থেকে সিরিয়াল বহির্ভূত পণ্যবাহী ট্রাকের বিল অব এন্ট্রি আটকাতে শুরু করি। গত ৪ এপ্রিল আরো একটি বিল অফ এন্ট্রি আটকায়। উদ্দেশ্য একটাই সিরিয়ালের নামে চাঁদাবাজি বন্ধের উদ্যোগ।। জরিমানার ভয়ে আমদানিকারকরা যেন চাঁদা দিয়ে সিরিয়াল বহির্ভূত গাড়ি বন্দরে না ঢুকায়। কিন্তু ঘটে যায় বিপত্তি। ঐদিন রাতে একজন আমদানিকারক জানাই, সিরিয়াল বহির্ভূত আমদানিজাত পণ্যবাহী ট্রাক আটকানো যাবে না। কারণ জানতে চাইলে সে আমাকে জানালো, এক প্রশাসনিক কর্মকর্তার কথা। ওই আমদানিকারকের পীড়াপীড়িতে সিরিয়াল বহির্ভূত গাড়ির বিল অব এন্ট্রি আটকাতে ব্যর্থ হই। পরদিন ওই প্রশাসনিক কর্মকর্তার কাছে ফোন করেছিলাম। তিনি সাফ জানিয়ে দিলেন, ওপারে চাঁদাবাজি হচ্ছে আমাদের তাতে কি। বললাম ভোমরা বন্দরের ৮টি সংগঠনের যৌথ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সিরিয়ালের নামে চাঁদাবাজি বন্ধের জন্য জরিমানার সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে চাই। ওই কর্মকর্তাকে বুঝাতে ব্যর্থ হলাম। বুঝতে পারলাম “ডাল মে কুচ কালা হে”! নিজেদের মধ্যে ভূল বুঝাবুঝি ও মতপার্থক্যের কারণে আহ্বায়ক এজাজ আহমেদ স্বপন এর স্থলাভিষিক্ত হন আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মোঃ মিজানুর রহমান।

সম্ববত ১৩ এপ্রিল, আহ্বায়ক মিজানুর রহমানের সাথে ওই প্রশাসনিক কর্মকর্তার সাথে দেখা করতে গেলাম। বললাম, আপনার কারণে সিরিয়ালের নামে চাঁদাবাজি বন্ধ করতে পারলাম না। তিনি আশ্বস্ত করলেন, ওপারের সম মর্যাদার প্রশাসনিক কর্মকর্তার সাথে কথা বলবেন।

এরই মধ্যে ভোমরা সিএন্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের ত্রি বার্ষিক নির্বাচনে তফসিল ঘোষণা হল। অতীতে না থাকলেও এবারের কমিটিতে আমার আগ্রহ ছিল, এমন একটি কমিটি তৈরি করা যাদের নেতৃত্বে সিরিয়ালের নামে চাঁদাবাজি বন্ধ করে ভোমরা বন্দরকে রক্ষা করা যায়। ক্ষমতাসীন দলের একাধিক শীর্ষ নেতৃবৃন্দের সাথে কথা বললাম। আশ্বস্ত করা হলো, আওয়ামী লীগপন্থী সিএন্ডএফ এজেন্টদের নিয়ে কার্যনির্বাহী কমিটি গঠন করা হবে। ক্ষমতাসীন দলের দুই শীর্ষ নেতা ও এক প্রশাসনিক কর্মকর্তার সমন্বয়ে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় ৯ সদস্যের কার্যনির্বাহী কমিটি চূড়ান্ত করা হবে। তফসিল অনুযায়ী গত ৯ মে ছিল নির্বাচনের মনোনয়নপত্র সংগ্রহের নির্ধারিত দিন। আগের দিন রাতেই খবর পেলাম ভোমরা সিএন্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের গুরুত্বপূর্ণ পদ হাইব্রিড নেতাদের দখলে চলে যাচ্ছে। মোটা অংকের লেনদেনের কথা মানুষের মুখে মুখে ফিরছে। বুঝতে অসুবিধা হলো না, আমাদেরকে পুঁজি করে তারা বাণিজ্য করতে দ্বিধা করছে না।

ভোমরা সিএন্ডএফ এজেন্ট অ‌্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক যুবলীগ নেতা মিজানুর রহমান ও আমি নিজেই সিদ্ধান্ত নিলাম এটা কখনোই মেনে নেওয়া যায় না। কথা হল আরো কয়েকজনের সাথে। মনোনয়নপত্র সংগ্রহের নির্ধারিত দিনে আমি যাওয়ার আগেই মিজান ভোমরায় পৌঁছে গেছে। আমি ভোমরা সিএন্ডএফ এজেন্ট অ‌্যাসোসিয়েশন ভবনে পৌঁছে দেখি বিশাল পুলিশ বাহিনী । গাড়ি থেকে নেমে অ্যাসোসিয়েশনের অফিস কক্ষে যেতে পুলিশের বাধার সম্মুখীন হলাম। সাতক্ষীরা সদর থানা পুলিশ ও জেলা গোয়েন্দা বিভাগের কয়েকজন ইন্সপেক্টর ও সাব্ ইন্সপেক্টর পদমর্যাদা সম্পন্ন অফিসার বিশাল বাহিনী নিয়ে ভবনের গেটে অবস্থান করছেন। অধিকাংশ পুলিশ অফিসার পরিচিত। তাদের সাথে রয়েছে সুন্দর সুসম্পর্ক। ছোট্ট শহরে প্রতিনিয়ত দেখা হয়। প্রতিনিয়ত তাদের সাথে কুশলাদি বিনিময় হয় । এদের মধ্যে একজন সাতক্ষীরা সদর থানার ইন্সপেক্টর তারেক বিনয়ের সাথে বললেন, দাদা এখানে ঢোকা যাবে না। নির্দেশনা নেই। অফিস কক্ষে বসে ছিলেন আহ্বায়ক মিজানুর রহমান। খবর পেয়ে সে বাইরে বেরিয়ে এলো। আমাকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে সে নিজেও পুলিশের বাধার সম্মুখীন হল। নির্বাচন কমিশনের কেউ ভোমরা সিএন্ডএফ এজেন্ট অ‌্যাসোসিয়েশন ভবনে আসেনি। মিজান ও আমি বাইরে অপেক্ষা করার সময় দেখতে পেলাম, অনেকেই মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করতে এসে পুলিশের বাঁধার মুখে পড়ে ফিরে গেল। যেসব পুলিশ অফিসাররা দায়িত্বরত ছিল তাদের অধিকাংশই পরিচিত। তাদেরকে দিয়ে ঐদিন যে দায়িত্ব পালন করানো হলো, তা কতটুকু বৈধ ছিল? আর এই চেনা পুলিশগুলো কেনই বা হঠাৎ অচেনা হয়ে গেল? একজন সহকর্মী বলল, দাদা টাকার কাছে চেনা মানুষ অচেনা হয়ে যায়।

লেখক পরিচিত :
সংবাদকর্মী, সিএন্ডএফ এজেন্ট ও আমদানীকারক

সম্পর্কিত পোস্ট

মতামত দিন