জাতীয় ডেস্ক :
রাজধানীর বনানীর সৈনিক ক্লাব মোড়ে বাসচাপায় পা হারানো পরমাণু শক্তি কমিশনের কর্মকর্তা আফরোজা বেগমের কথা মনে আছে? ২০২০ সালের ৪ সেপ্টেম্বরে নরসিংদী থেকে ফেরার পথে বাস থেকে নেমে দ্রুত রাস্তা পার হতে গেলে ওই বাসের নীচেই তিনি চাপা পড়েন। অথচ নিয়ম অনুযায়ী বাস থেকে নেমে তার বাম পাশের ফুটপাতে আসার কথা ছিল। দায়িত্ব ছিল দেখেশুনে রাস্তা পার হওয়ার। আবার কাছেই ছিল ফুট ওভারব্রিজও। কিন্তু এর কিছুই তিনি মানেননি।
শুধু আফরোজা বেগম নন, তার মতো বহু মানুষ প্রতিদিন ইচ্ছা-খুশি মতো রাস্তা পারাপার হচ্ছেন। কখনো বাধ্য হয়ে, কখনো বা অভ্যাসবশত অমান্য করছেন ট্রাফিক আইন। হেডফোন কানে লাগিয়ে বা হাতের নাগালে ফুটওভারব্রিজ রেখে অভ্যাসগত দৌড়ে রাস্তা পার হতে গিয়ে চলন্ত যানবাহনের সামনে পড়ে যাওয়া তো হরহামেশাই ঘটছে। এতে বাড়ছে পথচারীদের মৃত্যুর মিছিল। তবুও সচেতনতা ফিরছে না অধিকাংশের মধ্যে।
আবার পথচারী চলাচল বা পারাপরে রাখা হচ্ছে না তেমন কোনো সুবিধা, কিছু জায়গায় সেই সুবিধা থাকলেও পথচারীদের উদাসীনতায় তা কোনো কাজে আসছে না। এছাড়া রাজধানীতে অপ্রয়োজনীয় জায়গায় ফুটওভারব্রিজ তৈরির পাশাপাশি ভাঙা ফুটপাতে হাঁটার অবস্থা নেই বললেই চলে। আবার এই ফুটপাতেই বসানো হয়েছে বিদ্যুতের খুঁটি, টেলিফোন বক্স ও নামানো হয়েছে ফুটওভারব্রিজের সিঁড়ি।
তবে কিছু ক্ষেত্রে পথচারীর দায় থাকা সত্ত্বেও আইনি পদক্ষেপে কখনো পথচারীকে দায়ী করা হয় না। এমনকি জরিমানা ও মোবাইল কোর্ট বসিয়েও পথচারীদের শৃঙ্খলায় আনতে এবং সচেতন করতে সরকারের কোনো চেষ্টাই এখন পর্যন্ত খুব ফলপ্রসূ হয়নি।
এটা নেই ওটা নেই বলে দেশের নাগরিকদের অভিযোগের কোনো শেষ নেই। কিন্তু সংকট আর অনিয়মের সব দায় প্রশাসনের ওপর চাপিয়ে প্রতিনিয়ত নিজেদের দায়িত্বটুকু এড়িয়ে চলেন পথচারীরা। ফলে তাদের হাতে অনেক সমস্যার প্রাথমিক সমাধান থাকলেও বদলায় না আচরণ বদলায় না সড়কের চিত্র।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির এক পর্যালোচনা দেখা যায়, দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় যতো মানুষ নিহত হয় তার মধ্যে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশই পথচারী। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন- এই ছয় মাসের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, জানুয়ারি মাসে দেশে ৫৫৪টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। এতে ৫৭১ জন নিহত হন এবং আহত হন ৯২২ জন। এর মধ্যে শুধু পথচারী নিহত হন ১৬৬ জন এবং আহত হন ২০ জন।
ফেব্রুয়ারি মাসের ৪৯৫টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন ৫৫৬ জন। এরমধ্যে পথচারী ছিলেন ১১২ জন। একইভাবে মার্চে ৫০৬টি দুর্ঘটনায় নিহত হন ৫৪৬ জন, যেখানে পথচারীর সংখ্যা ছিল ১০৪ জন। এপ্রিলে ৪৩২টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন ৪৬৮ জন। এদের মধ্যে পথচারী নিহত হন ৮২ জন। মে মাসে ৫৯৮টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন ৬১৫ জন। এদের মধ্যে পথচারী ছিলেন ১২৮ জন এবং জুন মাসে ৪৫২টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা ছিল ৪৬৬ জন। যেখানে পথচারী ছিলেন ১১৫ জন।
একটু সময় হাঁটলেই নিরাপদে রাস্তা পার হওয়ার ব্যবস্থা আছে। কিন্তু নিজের নিরাপত্তার খাতিরেও সে সময়টুকু খরচ করতে রাজি নন পথচারীরা। সব মিলিয়ে রাস্তা পারাপারে বেড়েই চলেছে খামখেয়ালিপনা। জটিল এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে পুলিশ খুঁজছে সমাধানের পথ। সচেতনতামূলক নানা কর্মসূচির পাশাপাশি ‘অবাধ্য পথচারী’কে নিয়মের মধ্যে আনতে চলছে পরিকল্পনা।
এজন্য সবার আগে জনসচেতনা বাড়ানোর ওপর জোর দিলেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিকের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. মুনিবুর রহমান। তিনি বলছেন, রাস্তা পারাপারে ট্রাফিক সিগন্যাল মানতে চান না অধিকাংশ। এমনকি এক থেকে দুই মিনিটও অপেক্ষা করতে চান না কেউ কেউ- এটা যেমন ঠিক তেমনি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় ব্রিজগুলো করা হয়, ফলে পথচারীরা তা ব্যবহার করতে অনীহা প্রকাশ করেন- এটাও ঠিক। এজন্য জনসমাগম বুঝে এবং রাজধানীর বড় বড় মোড়গুলোতে সার্কুলেটেড ব্রিজ করতে পারলে সেটা সবার জন্যই ভালো হবে।
এদিকে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে পথচারীদের সঙ্গে কথা বলেও পাওয়া গেছে নানা অভিযোগ-অনুযোগ। কেউ বলছেন, হেঁটে চলাচলের ব্যবস্থা নেই, ফুটপাত দখল হয়ে গেছে। আবার কেউ বলছেন, ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার অযোগ্য, পর্যাপ্ত জেব্রাক্রসিং নেই- এমন নানা কথার পাশাপাশি ‘সময় স্বল্পতার’ কথা মনে করে ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পারাপারের কথাও স্বীকার করেছেন অনেকে।
ফুটওভারব্রিজ কাদের জন্য?
সড়ক দিয়ে পারাপার এড়াতে যাদের জন্য তৈরি হয়েছে ফুটওভার ব্রিজ, সেই পথচারীদেরই পা পড়ে না রাজধানীর অধিকাংশ ফুটওভার ব্রিজে। বিভিন্ন এলাকা ঘুরে কিছু ফুটওভার ব্রিজে মাঝে মধ্যে লোকজনের চলাচল দেখা গেছে। কোনোটিতে একেবারেই কারো পা পড়ে না। এরমধ্যে কিছু চলে গেছে ছিন্নমূল মানুষের দখলে। আবার বাসস্ট্যান্ডের কাছাকাছি না থাকায় ব্যবহার হচ্ছে না কোনো কোনো ব্রিজ। অন্যদিকে দুর্বলরা কীভাবে যাওয়া-আসা করবে সেটাও মাথায় রাখা হয় না।
সম্প্রতি পথচারী পারাপার ঠেকাতে রাজধানীর শ্যামলীতে সড়ক বিভাজক এবং কলেজগেটে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সামনের ইউটার্ন বাঁশ দিয়ে আটকে দেওয়া হয়েছে। তবুও মাথার উপর ফুটওভার ব্রিজ রেখে দ্রুতগামী গাড়ির দিকে হাত উঁচিয়ে দৌড়ে রাস্তা পার হতে দেখা গেছে অধিকাংশ পথচারীকে। এরমধ্যে যাতায়াতের সুবির্ধার্তে শ্যামলীতে দেওয়া বাঁশের বেরিকেড ভেঙে ফেলেছেন পথচারীরা। আর শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা নিতে আসা রোগী এবং তাদের স্বজনদের বাঁশের বেড়া টপকে অথবা বেড়ার নিচ দিয়ে সড়ক পার হতেই যেন বেশি উৎসাহ। অথচ ওই ফুটওভার ব্রিজে নেই হকারের তেমন উৎপাত, আছে নিরাপত্তা বাতি। তবে দুই-তিনজন ছিন্নমূলকে শুয়ে থাকতে দেখা গেছে।
যোগাযোগবিদরা বলছেন, পথচারীদের পারাপারে ফুটওভার ব্রিজ টেকসই ও পরিবেশসম্মত কোনো সমাধান নয়। কিন্তু বিভিন্ন সময় মানুষের দাবির মুখে, কখনও আন্দোলন সামাল দিতে অথবা দৃশ্যমান উন্নয়ন দেখাতে যত্রতত্র এসব ব্রিজ তৈরি করা হয়েছে। সেখানে নাগরিকদের সুবিধার বিষয়টি উপেক্ষিতই থেকেছে।
বুয়েটের দুর্ঘটনা রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক সাইফুন নেওয়াজের মতে, পথচারী পারাপারের জন্য ফুটওভার ব্রিজ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত না। তিনি বলেন, আমাদের দেশের ফুটওভার ব্রিজগুলো তৈরি করা হয় সক্ষম মানুষদের কথা চিন্তা করে। ফলে সবাই উঠতে পারে না। অথচ ব্রিজগুলোতে চলন্ত সিঁড়ি ও র্যাম্প থাকবে। যেখানে সক্ষম-অক্ষম সবাই পারপার হবে।
তিনি বলেন, দুই মোড়ের মাঝামাঝি জায়গায় ফুটওভার ব্রিজ করতে হবে। যেখানে ব্রিজগুলো তৈরি করা হচ্ছে সেখানে মানুষের পারাপার কম। আবার তা বানানোর পরে সার্বক্ষণিক তদারক করতে হবে। যার কিছুই আমাদের দেশে হচ্ছে না। অন্যদিকে পথচারীরাও সচেতন হচ্ছেন না। এমন অবস্থায় সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো বেশ চ্যালেঞ্জিং বলেই মনে করেন সাইফুন নেওয়াজ।
এই যোগাযোগ বিশেষজ্ঞের মতে, মূলত বিভিন্ন আন্দোলনের ফসল হিসেবে স্পিড ব্রেকার আর ফুটওভার ব্রিজ বানানো হচ্ছে। যেকোনো দুর্ঘটনা ঘটলে কর্তৃপক্ষ একটা স্পিড ব্রেকার বানিয়ে দেয়। আর বড়সড় আন্দোলন হলে ফুটওভার ব্রিজ বানিয়ে দেওয়ার একটা সংস্কৃতি এ দেশে চলে এসেছে। কিন্তু পুরো সিস্টেমকে পরিবর্তন করতে সবাইকে নতুন করে ভাবতে হবে।
মিরপুর সড়কের কলাবাগান, শুক্রাবাদ, সোবহানবাগ, ধানমন্ডি ২৭ নম্বর, আসাদগেট, শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজের সামনের ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার হয় না বললেই চলে। আরামবাগে নটরডেম কলেজ এবং মতিঝিল সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে দুটি ফুটওভার ব্রিজ থাকলেও পথচারীদের পা তেমন পড়ে না। পুরান ঢাকার ভিক্টোরিয়া পার্ক থেকে সদরঘাট যেতে চিত্তরঞ্জন এভিনিউর ব্রিজটিও অনেকটাই অব্যবহৃত পড়ে আছে।
অন্যদিকে গুলিস্তান ও গাবতলীতে পাতাল সড়ক (আন্ডারপাস) থাকলেও খুব কম পথচারীকে তা ব্যবহার করতে দেখা গেছে। তবে কারওয়ান বাজারের পাতাল সড়ক ব্যবহার করতে দেখা গেছে অপেক্ষাকৃত বেশি পথচারীকে।
এছাড়া নিউ মার্কেট, সায়েন্স ল্যাবরেটরি, শ্যামলী, কল্যাণপুর, বাংলামোটর, ফার্মগেট, বনানীর চেয়ারম্যান বাড়ি, কাকলী, খিলক্ষেত, শ্যাওড়া, বিমানবন্দর, আজমপুর, হাউজবিল্ডিং এলাকার ফুটওভারব্রিজে লোকজনের সার্বক্ষণিক চলাচল আছে। আর মেট্রোরেলের কাজ চলায় মিরপুর এলাকার বেশ কিছু জায়গায় ফুটওভার ব্রিজ উঠিয়ে ফেলা হয়েছে। সেখানে পথচারীরা বাধ্য হয়েই ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পারাপার হন।
ফলে যেখানে ব্যস্ত সড়কগুলোতে ফুট ওভারব্রিজ ব্যবহারে আগ্রহ নেই পথচারীদের, সেখানে নতুন করে ওভারব্রিজ নির্মাণ করলে কী লাভ হবে?
বুয়েটের সহযোগী অধ্যাপক সাইফুন নেওয়াজ বলেন, রাস্তা পারাপারে সবচেয়ে জরুরি ও সহজ ব্যবস্থা জেব্রা ক্রসিং। রাজধানীতে যেসব স্থানে জেব্রা ক্রসিং আছে, সেগুলোর ব্যবহার কম। অনেক স্থানে দাগ মুছে গেছে। হেঁটে রাস্তা পারাপারের ব্যবস্থা খুবই কম স্থানে রয়েছে। ফলে যে যেভাবে পারছে, রাস্তা পার হচ্ছে।
তার মতে ফুটওভার ব্রিজ তৈরির পেছনে টাকা খরচ হচ্ছে ঠিকই কিন্তু তা কার্যকর হচ্ছে না, পথচারীদের কাজে আসছে না।
ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. মুনিবুর রহমানের মতে, পথচারীদের যত্রতত্র পারাপার বন্ধে পুলিশ ও বিআরটিএ মামলা ও জরিমানা আদায় করছে, তাদের সচেতন করেছে। ফলে পুরোপুরি না হলেও পরিবর্তনের ধারা সূচিত হয়েছে। বিষয়টির পুরোপুরি সুফল পেতে সড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে সচেতনতামূলক বার্তা লিখে দেওয়ারও সুপারিশ করেন তিনি।
সড়কের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার দাবিতে দেশের নাগরিকরা যতটা সোচ্চার, নিজেদের জীবনের নিরাপত্তার কথায় তারা ঠিক ততটাই উদাসীন। ফলে প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনায় কেউ না কেউ জীবন দিচ্ছে। কিন্তু এর কোনো প্রতিকার হচ্ছে না। ফলে সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে আর যেন কোনো প্রাণ ঝরে না যায় সে ব্যবস্থা সরকারের পাশাপাশি নাগরিকদেরই করতে হবে।
