বাণিজ্য ডেস্ক :
ইউক্রেন যুদ্ধের জেরে মস্কোর তেল রফতানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ইউক্রেনের মিত্র ইউরোপীয় দেশগুলো। এগুলো আগামী ৫ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হবে। নিষেধাজ্ঞার শর্ত হিসেবে রাশিয়া থেকে সমুদ্রপথে তেল আমদানি বন্ধ করবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, তবে পাইপলাইনে তেল সরবরাহকে এ নিষেধাজ্ঞার বাইরে রাখা হয়েছে। রাশিয়া থেকে ইউরোপে অপরিশোধিত তেল সরবরাহের ৯০ শতাংশই হয় সমুদ্রপথে।
নিষেধাজ্ঞার সময় যতই এগিয়ে আসছে, ততই রাশিয়া থেকে তেল আমদানি বাড়িয়ে দিচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। বিজনেস ইনসাইডারের দেয়া তথ্যমতে, গত সপ্তাহে সমুদ্রপথে দিনে এক মিলিয়ন ব্যারেল তেল রাশিয়া থেকে আমদানি করেছে ইউরোপ, যা গত এক মাসে সর্বোচ্চ।
ব্লুমবার্গের তথ্যমতে, এক মাস আগেও দিনে ৮ লাখ ৯০ হাজার ব্যারেল তেল সমুদ্রপথে রাশিয়া থেকে আমদানি করত ইইউ।
সব মিলিয়ে বিশ্ববাজারে গত সপ্তাহ পর্যন্ত দিনে ৩২ লাখ ব্যারেল তেল সমুদ্রপথে বিশ্ববাজারে রফতানি করেছে রাশিয়া, যা তার আগের সপ্তাহ থেকে ১৩ শতাংশ বেশি বলে জানিয়েছে ব্লুমবার্গ।
এশিয়ায় রাশিয়ার তেল সরবরাহ স্থিতিশীল থাকলেও সমুদ্রপথে ইউরোপে রাশিয়ার তেল রফতানি ২০ শতাংশ বেড়েছে।
নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডাম, রটেরডাম, অ্যান্টআর্পে ইউরোপের প্রধান প্রধান অপরিশোধিত তেলের শোধনাগার অবস্থিত। এসব শোধনাগারেও রাশিয়া থেকে আসা তেলের সরবরাহ ১৩ শতাংশ বেড়েছে।
এদিকে ইউরোপ রাশিয়া থেকে তেল আমদানি বাড়িয়ে দেয়ায় ব্যাপক মুনাফা লুটছে রাশিয়ার তেল কোম্পানিগুলো। গত সপ্তাহে অপরিশোধিত তেল বিক্রি থেকে মস্কোর পকেটে ঢুকেছে ১৬ কোটি ডলার, যা তার আগের সপ্তাহ থেকে ১২ শতাংশ বেশি।
রাশিয়ার অর্থ মন্ত্রণালয় এবং ভেসেল ট্রাকিং ডেটা থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মস্কোর তেল বিক্রির রাজস্বের এ হিসাব জানায় ব্লুমবার্গ।
ইউরোপ এমন একটি সময়ে রাশিয়ার তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, যখন বিশ্বের অন্যান্য স্থানেও তেলের উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। তার ওপর সম্প্রতি ইউরোপে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে রাশিয়া।
এ পরিস্থিতিতে রাশিয়া থেকে ইউরোপে তেল আমদানির এ চিত্রই বলে দিচ্ছে জ্বালানির জন্য ইউরোপীয় দেশগুলো রাশিয়ার ওপর কতটা নির্ভরশীল।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি প্রতিষ্ঠান শেলের প্রধান নির্বাহী বেন ভ্যান বোর্দে বলেন, ‘বর্তমানে তেলের বাজার খুব সংকীর্ণ। আসছে দিনগুলোতে পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। ওপেক তার ঘোষিত সক্ষমতা অনুযায়ী তেল উত্তোলন করতে পারছে না। তাদের উৎপাদনের সামর্থ্য হ্রাস পেয়েছে। আমাদের দেখতে হবে ডিসেম্বর ৫ তারিখের পর কী হয়। তবে আগামী দিনগুলোতে অনিশ্চিত পরিস্থিতি অপেক্ষা করছে জ্বালানির বাজারে।’
গত ৩১ আগস্ট থেকে ইউরোপে গ্যাস সরবরাহের প্রধান পাইপলাইন নর্ডস্ট্রিম-১ পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রেখেছে রাশিয়া। ইউরোপের গ্যাসের চাহিদার অনেকাংশেই পূরণ হতো এ পাইপলাইন দিয়ে। এর আগে পোল্যান্ডের ওপর দিয়ে যাওয়া অপর পাইপলাইন ইয়ামালেও গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেয় মস্কো। রাশিয়ার ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত ইউরোপে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রাখার কথা জানিয়েছে মস্কো।
রাশিয়ার গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রাখার এ সিদ্ধান্ত জ্বালানি সংকটে বিপর্যস্ত ইউরোপের জ্বালানি নিরাপত্তাকে আরও ঝুঁকিতে ফেলেছে। শীতকালে ব্যবহারের জন্য এখনও প্রয়োজনীয় গ্যাস মজুত করতে পারেনি ইউরোপের অধিকাংশ দেশই। এ পরিস্থিতিতে নর্ডস্ট্রিম দিয়ে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হওয়ায় আসন্ন শীত মৌসুমে জ্বালানি সংকট তীব্র হওয়ার আশঙ্কা ইউরোপের। নর্ডস্ট্রিম-১ দিয়ে আসা গ্যাস দিয়েই নিজেদের স্টোরেজগুলো ভরানোর পরিকল্পনা করছিল জার্মানিসহ ইউরোপীয় অন্যান্য দেশ।
রাশিয়ার জ্বালানি খাতের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিলেও এর বিকল্প হিসেবে বিশ্বের অন্যান্য কোনো উৎস থেকে জ্বালানি সরবরাহের নিশ্চয়তা পায়নি ইউরোপ। ইরানের ওপর মার্কিন অবরোধের কারণে আপাতত সেখান থেকেও তেল আমদানি করতে পারছে না তারা। বিকল্প হিসেবে বিশ্বের তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর জোট ওপেকের দিকে তাকিয়ে থাকলেও সক্ষমতা কমে যাওয়ায় উল্টো তেলের উৎপাদন কমিয়েছে ওপেক।
এ ছাড়া বিশ্বজুড়েই বাড়তির দিকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির দাম। কাতার কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের মতো এলএনজি রফতানিকারক দেশ থেকে সমুদ্রপথে এলএনজি আমদানি করা ইউরোপের জন্য সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল।
এর মধ্যেই ডিসেম্বর থেকে সমুদ্রপথে রাশিয়া থেকে তেল আমদানি বন্ধের বিষয়টি কার্যকর হলে ইউরোপীয়দের জন্য তা হবে নিজের পায়ে কুড়াল মারার শামিল।
