জাতীয় ডেস্ক :
চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর ব্যবসায়ী জানে আলম হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ২০ বছর ধরে ড্রাইভারের ছদ্মবেশ ধারণ করেও বাঁচতে পারলেন না। অবশেষে র্যাবের কাছে ধরা খেলেন এই পলাতক আসামি।
বৃহস্পতিবার (৩ ফেব্রুয়ারি) রাতে নগরীর বন্দর থানার নিমতলা বিশ্বরোড থেকে আসামি জসিম উদ্দিন (৫০) নামের ওই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব-৭। তার বাড়ি লোহাগাড়ার আমিরাবাদে।
আসামি জসিম উদ্দিনের বরাত দিয়ে র্যাব জানায়, এই হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ হলো ব্যবসায়ী জানে আলম আপন ছোট ভাইয়ের হত্যাকাণ্ডে প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিলেন। জানে আলম পরিবারের বড় ছেলে এবং আর্থিকভাবেও কিছুটা সচ্ছল ছিলেন। তাই মামলা-মোকদ্দমার ব্যয়ভার তিনি বহন করতেন। এতে প্রতিপক্ষের আক্রোশ তার ওপর দিন দিন বেড়ে যায়।
প্রতিপক্ষের ধারণা ছিল, ব্যবসায়ী জানে আলমকে হত্যা করলে ওই পরিবারের মামলা-মোকদ্দমা চালানোর মতো কোনো লোক থাকবে না এবং প্রত্যক্ষভাবে আর কোনো সাক্ষীও থাকবে না। আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে এবং তার সব সম্পত্তি সহজে তারা গ্রাস করতে পারবে। এ কারণে ঘাতক চক্র প্রকাশ্যে ব্যবসায়ী জানে আলমকে নৃশংসভাবে হত্যা করে।
র্যাব আরও জানায়, জানে আলমের ছোট ভাইকে হত্যার পরপরই আসামি জসিম উদ্দিন (৫০) চট্টগ্রাম মহানগরীর ডাবলমুড়িং থানাধীন ফকিরহাট এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে ট্রাক চালিয়ে প্রায় তিন বছর বসবাস করেন। সেখান থেকে গিয়েই আলোচিত জানে আলম হত্যায় অংশগ্রহণ করেন। এরপর কালুরঘাট এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে বোয়ালখালী বিয়ে করেন এবং লোহাগাড়ায় নিজের পৈতৃক ভিটাবাড়ি ফেলে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে শুরু করেন।
এরপর কালুরঘাট এলাকায় ড্রাইভারি পেশায় তিন বছরের মতো অবস্থান করেন। পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রাম মহানগরীর আগ্রাবাদ ডেবারপাড় বাসা নিয়ে ড্রাইভারি পেশায় চার বছর বসবাস করেন। এরপর আবার ফকিরহাটে বাসা ভাড়া নিয়ে সাত বছর ড্রাইভারি পেশায় অবস্থান করেন। সেখান থেকে বাসা পরিবর্তন করে বন্দর থানাধীন নিমতলায় বাসা ভাড়া নিয়ে ড্রাইভারি পেশায় এখন পর্যন্ত অবস্থান করছিলেন। এই ২০ বছর তিনি ট্রাক ড্রাইভারের পেশায় নিজেকে আত্মগোপন করে রেখেছিলেন।
ট্রাক ড্রাইভারের লাইসেন্স ও অন্যান্য কাগজপত্র তৈরিতে তিনি ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করতেন এবং নিজ আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় ছিলেন বলে জানায় র্যাব।
এরই ধারাবাহিকতায় চট্টগ্রাম র্যাব-৭ গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জানতে পারে ব্যবসায়ী জানে আলম হত্যা মামলার অন্যতম পলাতক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি জসিম উদ্দিন চট্টগ্রাম মহানগরীর বন্দর থানাধীন নিমতলা বিশ্বরোড এলাকায় অবস্থান করছেন। সেই তথ্যের ভিত্তিতে গত বৃহস্পতিবার (৩ ফেব্রুয়ারি) রাতে অভিযান চালিয়ে জসিম উদ্দিনকে গ্রেফতার করে র্যাব। এরপর আসামিকে সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তর র্যাব।
উল্লেখ্য, ২০০২ সালের ৩০ মার্চ আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার প্রাক্কালে আনুমানিক সকাল ৯টার দিকে পূর্বশত্রুতার জের ধরে স্থানীয় কিছু দুষ্কৃতকারী ব্যবসায়ী জানে আলমকে (৪৮) তার এক বছরের শিশুসন্তানের সামনে প্রথমে লাঠিসোঁটা, দেশীয় ধারালো অস্ত্র ও হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করে এবং পরে মৃত্যু নিশ্চিত করার জন্য গুলি করে হত্যা করে। যা সেই সময়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। ওই ঘটনায় ভিকটিমের বড় ছেলে মো. তজবিরুল আলম বাদী হয়ে চট্টগ্রাম জেলার লোহাগাড়া থানায় ২১ জনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা করেন। যার মধ্যে জসিম উদ্দিন ছিলেন অন্যতম প্রধান আসামি।
এ ঘটনার চার মাস আগে ২০০১ সালের ৯ নভেম্বর নিহত জানে আলমের আপন ছোট ভাইকে ওই দুর্বৃত্তরাই একইভাবে হত্যা করে। ওই ঘটনায়ও চট্টগ্রাম জেলার লোহাগাড়া থানায় ১৩ জনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা করা হয়েছিল। সেই মামলায়ও জসিম উদ্দিন অন্যতম প্রধান আসামি ছিলেন।
২০০৭ সালের ২৪ জুলাই ব্যবসায়ী জানে আলম হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেন আদালত। রায়ে ১২ জনকে ফাঁসি এবং ৮ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে আসামিরা সুপ্রিম কোর্টে আপিল করলে আদালত জসিম উদ্দিনসহ ১০ জনকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত ও ২ জনকে যাবজ্জীবন এবং বাকিদের খালাস দেন।
