জাতীয় ডেস্ক :
নামে তাঁতিবাজার হলেও পুরান ঢাকার এ এলাকাটি বিখ্যাত সোনার দোকান, স্বর্ণকার ও কারিগরদের কর্মদক্ষতার জন্য। বলা হয়ে থাকে, দেশের সবচেয়ে বড় সোনার বাজার পুরান ঢাকার সুপ্রাচীন এ এলাকাটি।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে জজ কোর্টের পেছন দিয়ে হাঁটতে গেলেই সরু কয়েকটি গলিতে চোখে পড়ে সারি সারি সোনার দোকান। এখানে কেউ সোনা বিক্রি করছেন, কেউ বন্ধক রাখছেন, আবার কেউবা নিবিষ্ট চোখে গড়ছেন নিখুঁত সব গহনা।
রাস্তার পাশ দিয়ে বয়ে চলে খোলা নর্দমা, অল্প বৃষ্টিতেই রাস্তায় ওঠে পানি। এমনকি বৃষ্টি না থাকলেও স্যাঁতসেঁতে থাকে তাঁতিবাজারের রাস্তা। সাদা চোখে দেখলে এলাকাটিকে মনে হবে পশ্চাৎপদ ঘিঞ্জি কোনো গলি। কে বলবে–এ গলিকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে দেশের সর্ববৃহৎ সোনার বাজার। দেশের সব বড় বড় জুয়েলারি দোকানের কারিগর ও কারখানা এই তাঁতিবাজারে।
তাঁতিবাজার ঘুরে সময় সংবাদের সঙ্গে কথা হয় কয়েকজন কারিগরের। তারা জানান, খুব কঠিন জীবন কাটে তাদের। এখানে যেসব কারিগর থাকেন, তাদের বাবা-মা ছোটবেলায় তাঁতিবাজারের সোনার কারখানায় মহাজনের জিম্মায় রেখে গিয়েছেন তাদের। মহাজন ও ওস্তাদদের হাত ধরেই তাদের বেড়ে ওঠা, কাজ শেখা।
তাঁতিবাজারের সোনার কারিগর আবদুস সালাম বলেন, ‘বেশির ভাগ কারিগর এখানেই থাকে। নিচে সব দোকান আর ভাঙাচোরা এই বিল্ডিংগুলা হইলো কারখানা। কারিগররা কারখানায় কাজ করে, কারখানায়ই ঘুমায়। এখানে তাদের শৈশব থেকে যৌবনের সবটুকু কেটে যায়। আমার কথাই ধরেন, আমার দাদা স্বর্ণকার, বাপ স্বর্ণকার আর আমিও স্বর্ণকার। আমাদের জীবনে সোনার ব্যবসা, গহনা গড়া আর তাঁতিবাজারের এই রাস্তা ছাড়া আর তেমন কিছু নাই।’
আরেক কারিগর অমলেশ বলেন, ‘ছোটবেলায় এখানে আসছি। প্রতি মাসে বাড়ি যাইতাম। এখানে আছি বছর বিশেক হবে। নিজের একটা স্বপ্ন আছে: কাজ শিইখা নিজেই তাঁতিবাজারে একটা সোনার দোকান দিমু।’
তাঁতিবাজারের কারখানার একেক কক্ষে ১৫-২০ জন করে কারিগর থাকেন। এক কক্ষে এতজন কীভাবে থাকেন–প্রশ্ন করতেই সোনার কারিগর বীরেন সরকার বলেন, ‘এইটা তো কমই, ভাই। এক সময় একেক রুমে ৫০-৬০ জন কইরা থাকতাম। এখন কারিগর কইমা গেছে। আগের মতো আর নাই।’
কারিগর কেন কমে যাচ্ছে–এমন প্রশ্নে বীরেন বলেন, ‘গ্রামে গিয়া কামলা দিয়ে এর চেয়ে কম কষ্ট বেশি টাকা। গ্রামে দিনপ্রতি কামলারা পায় সর্বনিম্ন ৭০০ টাকা। আমাগো কোনো ধরাবাঁধা বেতন নাই। তবে গড়ে প্রতিদিন টাকা আসে ৮০০-১ হাজার টাকা। এইবার তিন বেলা খাওয়ার খরচসহ অন্যান্য খরচ তো থাকেই। মাস শেষে ৮-১০ হাজার টাকাও বাড়ি পাঠাইতে কষ্ট হইয়া যায়। কারখানায় মহাজন কাজের ওপরে ভিত্তি কইরা টাকা দেয়। মহাজন শুধু থাকতে দেয়, বাকি সব খরচ নিজের।’
গহনা গড়ার কাজ কতটা কঠিন উল্লেখ করে বীরেনের পাশে বসে কাজ করতে থাকা আরেক কারিগর প্রদীপ কর্মকার বলেন, ‘এইটা খুবই সূক্ষ্ম কাজ। আমাদের কোনো যন্ত্রপাতি নাই। প্রায় প্রতিটা কাজই হয় হাতে। কাজটা এতটাই সূক্ষ্ম যে চোখের ওপর অনেক চাপ পড়ে। এখানে অনেক কারিগর আছেন অল্প বয়সে যাদের দৃষ্টিশক্তি কমে গেছে। আমরা সকালে উঠে কাজ শুরু করি, দুপুরে খেয়ে হয়তো ঘণ্টাখানেক কারখানায়ই শুয়ে ভাতঘুম দেই, তারপর আবার কাজ শুরু করি। মাঝেমধ্যে মধ্যরাত পর্যন্ত কাজ চলে।’
প্রদীপ বলেন, ‘এত কষ্ট করে কাজ করি, মানুষ কিন্তু আমাদের চেনে না। আবার ধরেন, কাজ করতে গিয়া ডিজাইনে একটু ভুল করলাম–জুয়েলারি কিন্তু ওই গয়না আর নিবে না। তখন বেশির ভাগ সময় মহাজনও দায়িত্ব নেয় না। ডেমারেজ যা যায় আমাদের ওপর দিয়ে যায়।’
তাঁতিবাজারে সোনা বেচাকেনার পাশাপাশি বন্ধক রাখার মাধ্যমটিও বেশ জনপ্রিয়। বেশির ভাগ জুয়েলারি দোকানের ওপরই লেখা আছে: ‘এখানে স্বর্ণ বন্ধক রাখা হয়’। সোনা বন্ধক রাখা বলতে কী বোঝায়–জানতে চাইলে জুয়েলারি দোকানের কর্মচারী সাগর দাস বলেন, ‘মনে করেন, আপনার টাকার ঘাটতি দেখা দিছে, কিন্তু হাতে কিছু সোনা আছে। তখন আপনি চাইলে সোনা বন্ধক রাইখ্যা আমাদের থেইক্কা টাকা নিতে পারেন।’
টাকা দেয়ার পদ্ধতি সম্পর্কে সাগর বলেন, ‘এইটা একেকজনের কাছে একেক রকম। এইখানে ধরাবাঁধা কোনো নিয়ম নাই। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সোনার মূল দামের অর্ধেক টাকা বন্ধকিমূল্য হিসেবে দেয়া হয়। ধরেন, এক লাখ টাকার সোনা আনছেন, আপনি পাবেন ৫০-৬০ হাজার টাকা। আমরা সাধারণত ৬ মাসের জন্য বন্ধক রাখতে দেই। তবে ৬ মাস বললেও প্রায়ই বছর কেটে যায়।’
তাঁতিবাজারে মূলত যারা সোনা বন্ধক রাখেন তাদের গুনতে হয় বড় অঙ্কের সুদ। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে লাখপ্রতি মাসে এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত সুদ দিতে হয়।
এ ব্যাপারে সোনা ব্যবসায়ীরা বলছেন, এটা মূলত স্বল্পকালীন ঋণের মতো। সুদের টাকা না ওঠালে তাদের লাভ বলে কিছু থাকে না। অনেক সময় সুদের টাকা তুলেও লাভ করতে পারেন না তারা।
পুরান ঢাকার হাজারো গলির পরতে পরতে গড়ে উঠেছে শত রকমের ব্যবসা। ঢাকার চাকচিক্যময় সুপার শপ থেকে শুরু করে মেগামলগুলো দাঁড়িয়ে আছে পুরান ঢাকার মলিন গলির এসব ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর ওপর ভর করে। বিশেষ করে তাঁতিবাজারের মতো মাছের কানকা পচা, ময়লা ভাসা পলিথিন-প্লাস্টিক আর নর্দমার জলের মাঝে যেভাবে টিকে আছে দেশের সোনার বাজার, তাতে অবাক না হয়ে পারা যায় না–এমনটাই বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
