রাজনীতি ডেস্ক :
ঢাকা শহরের যানজটের সঙ্গে সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্র গুপি গাইন বাঘা বাইনের সাদৃশ্য পাওয়া যায়। চলচ্চিত্রে গুপি যখন গান করত তখন আশপাশের সবকিছু ফ্রিজ হয়ে যেত। একই দশা যেন ঢাকার রাস্তাঘাট ও পাবলিক ট্রান্সপোর্টে। সেই দশা থেকে কিছুটা স্বস্তি দিতেই দেশে আবির্ভূত হয়েছিল রাইড শেয়ারিং সার্ভিস, যা এখন তীব্র হতাশা ও বিরক্তির নাম।
দীর্ঘ জ্যাম, ভাড়া নিয়ে কেচাল, গন্তব্যে পৌঁছানোর তাড়া౼এসব সমস্যার সমাধান হিসেবে ২০১৬ সালের মাঝামাঝি পাঠাও তাদের রাইড শেয়ারিং সেবা চালু করে। ওই একই বছরের ২২ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে অ্যাপের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করে ট্যাক্সি সেবাদানকারী কোম্পানি উবার-ও। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বিপুল জনপ্রিয়তা পায় এসব রাইড শেয়ারিং সার্ভিস।
পাঠাও-তে মোটরবাইকের সুবিধা থাকলেও উবারে মোটরবাইক ও প্রাইভেট কার উভয় সুবিধা থাকার কারণে মানুষের কাছে উবার বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। অথচ বিপুল জনপ্রিয়তা পাওয়া রাইড শেয়ারিং সার্ভিসের বর্তমান অবস্থা এখন বেশ শোচনীয়। রাইড শেয়ারিং সেবার নানামুখী ভোগান্তিতে সে সময়ের স্বস্তি এই সময়ে এসে হয়ে উঠেছে বিরক্তির প্রকাশ হিসেবে। তারপরও কেউ কেউ বাধ্য হয়েই ব্যবহার করছেন এসব রাইড শেয়ারিং অ্যাপ। তবে বর্তমান সময়ে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে যাত্রীরা কন্ট্রাকে যাতায়াত করেন। এর অন্যতম কারণ অবশ্য চালকদের অ্যাপের প্রতি অনাগ্রহ। যার ফলে প্রয়োজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলোতেই কোনো রাইডার পাওয়া যায় না। অথচ রাস্তার বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে দেখা যায় অসংখ্য রাইডার।
এদিকে বুধবার (২০ জুলাই) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে জনপ্রিয়তা হারানো রাইড শেয়ারিং সেবা প্রদান করা পাঠাও এবং উবার দেশের রাইড শেয়ারিং খাতে নিরাপত্তার মান বাড়াতে যৌথ ক্যাম্পেইন পরিচালনার কথা বলে। পাশাপাশি গ্রাহকদের উন্নত অভিজ্ঞতা প্রদান করার লক্ষ্যে কাজ করবে বলে আশ্বস্ত করে। কিন্তু তাতেও ফলপ্রসূ কোনো সমাধান আসেনি।
বিশ্বস্ততার দিক দিয়ে পাঠাও-র তুলনায় উবার এগিয়ে থাকায় বেশির ভাগ মানুষ উবার ব্যবহার করে থাকেন। কিন্তু উবার কি সেই বিশ্বস্ততার যথাযথ মূল্যায়ন করতে পারছে?
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইটে ১৪টি রাইড শেয়ারিং সার্ভিস নিবন্ধিত থাকার তথ্য রয়েছে। তবে ঢাকায় সাধারণত ‘উবার’ অ্যাপ থেকেই মানুষ গাড়ি পায়। এর বাইরে ‘ওভাই’ থেকে সব সময় না মিললেও মাঝেমধ্যে গাড়ি পাওয়া যাচ্ছে। পাওয়া যাচ্ছে সিএনজি। তবে তা অতটা জনপ্রিয় হয়নি। পাঠাও এবং সহজ থেকে মোটরসাইকেল মিললেও প্রাইভেট কার পাওয়া যায় না। ফলে রাজধানীতে একচেটিয়াভাবেই আধিপত্য করছে উবার।
বৃহস্পতিবার (২৮ জুলাই) বেলা ১১টার দিকে শ্যামলী থেকে ফার্মগেট যেতে উবারে কল করলে ৫.১ কিলোমিটার দূরত্বের ভাড়া আসে ১৯৬ টাকা। শুধু ভাড়া যাচাইয়ের জন্য আরেক রাইড শেয়ারিং অ্যাপ পাঠাও-তে কল করলে সেখানে আসে ১৩১ টাকা। সমান দূরত্বে উবারে ভাড়া বেশি এলো ৬৫ টাকা। তারপরও বিশ্বস্ততা এবং রাইডার প্রাপ্তির সম্ভাবনা বেশি বিবেচনায় উবারে কল করলে এক রাইডার ফোন ধরে কোথায় যাব জিজ্ঞেস করেন, ‘ওইদিকে যাব না’ বলে কল কটে দেন। বেশ কয়েকজন একই কাজ করেন। পাঠাও অ্যাপে চেষ্টা করেও কোনো লাভ হয়নি।
এভাবে ৪০ মিনিট ধরে উবার ও পাঠাও দুটো রাইড শেয়ারিং অ্যাপেই গাড়ি পাওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন আশিক রহমান।
আরেক যাত্রী সাদিয়া ইসলাম রোজা বলেন, বিজ্ঞাপনী সংস্থায় কাজ করার ফলে প্রায়ই রাত করে বাড়ি ফিরতে হয়। দ্রুত ও নিরাপদে বাসায় যেতে অন্য সব অ্যাপের তুলনায় উবারে যাতায়াত করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি, কিন্তু তাতেও যে গন্ডগোল। প্রয়োজনের সময় কল করলে উবারেও ঠিকমতো রাইডার পাই না। কখনো রাইডার পেলেও বেশির ভাগ সময় তারা গন্তব্যের কথা জিজ্ঞেস করে পরে আর যেতে চায় না। যদি যেতে চায়-ও, তখন তারা নির্ধারিত ভাড়ার থেকে কিছু টাকা বাড়িয়ে দিতে বলে। যেখানে দূরত্ব অনুযায়ী অ্যাপে ভাড়া অলরেডি অনেক বেশি। সে সময় উপায় না দেখে, একপ্রকার বাধ্য হয়েই যেতে হয়।
তার মতে, উবারে ভাড়া কমানো উচিত। পাশাপাশি নারীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে নারী যাত্রীদের ফোন কলের আলাদা কোনো সিস্টেম চালু করা উচিত। যেখানে কোনো নারী কল করলে সেই কল রাইডারের কাছে আগে পৌঁছাবে। আমাদের সমাজ ব্যবস্থা ও রাস্তাঘাটের নিরাপত্তাজনিত ইস্যুতে সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে তিনি মনে করেন।
কলেজপড়ুয়া এক ছাত্রী রেজওয়ানা পুষ্প বলেন, অনেক সময় চালকরা অযাচিত ব্যবহার ও বাজে আচরণ করেন। এখন পর্যন্ত এসবের বিরুদ্ধে যতবার অভিযোগ করেছি কোনো প্রতিকার পাইনি। এমনকি উবারের অভিযোগ জানানোর পদ্ধতি বেশ জটিল, যা একজন সাধারণ মানুষের পক্ষে অভিযোগ জানানোটা বেশ ঝামেলার।
বেসরকারি চাকরিজীবী সাদমান বলেন, মূলত বাংলাদেশের মানুষ ও আমাদের স্বভাবজাত প্রবৃদ্ধিতেই দরদামের বিষয়টি রয়ে গেছে। তাই যতই স্মার্ট পদ্ধতি আসুক না কেন, আমরা দরদাম করতেই পছন্দ করি। তাই বর্তমান সময়ে রাইড শেয়ারিং সেবা হয়ে উঠেছে বাণ্যিজিক মাধ্যম। যা ব্যবসায়িক ক্ষেত্র হিসেবেই বেশি পরিচিত।
বাংলাদেশে রাইড শেয়ারিং অ্যাপ বলতে প্রথমেই মাথায় আসে উবার ও পাঠাও-এর নাম। এত এত অভিযোগের পর-ও তাদের এমন নির্লিপ্ত আচরণের কারণ আসলে কী? এ বিষয়ে সরকারি কোনো নীতিমালা রয়েছে কি না, যাচাই করতে গিয়ে জানা যায়, রাইড শেয়ারিং সার্ভিস পরিচালনার ক্ষেত্রে বেশ কিছু শর্ত রাখা আছে সরকারি নীতিমালায়। এর মধ্যে রয়েছে:
১. প্রতিষ্ঠান ও যানবাহনের মালিককে বিআরটিএতে তালিকাভুক্ত হতে হবে।
২. রাইড শেয়ারিং সার্ভিস প্রতিষ্ঠানের সার্ভিস এলাকায় অফিস থাকতে হবে।
(কিন্তু বাস্তবতা হলো অফিস তো দূরের কথা সুপরিচিত প্রতিষ্ঠান উবারে যাত্রীদের সরাসরি অভিযোগ জানানোর কোনো সুযোগই নেই।)
৩. যাত্রীর অভিযোগ জানানোর সুযোগ রাখতে হবে।
৪. অ্যাপে এসওএস সুবিধা রাখতে হবে, যাতে স্পর্শের সঙ্গে সঙ্গে চালক ও যাত্রীর লোকেশন ৯৯৯ নম্বরে চলে যায়।
৫. অ্যাপে অভিযোগ দায়ের ও নিষ্পত্তির সুবিধা থাকতে হবে।
৬. রাইড শেয়ারিং প্রতিষ্ঠানের কল সেন্টার ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখতে হবে।
(কিন্তু কার্যত এ ধরনের কোনো কল সেন্টারই নেই। ফলে যাত্রীরা যেমন গাড়ি পেতেও চালকের মর্জির ওপর নির্ভর করেন আবার গাড়ি বা বাইকে উঠেও অনেকে দুর্ব্যবহারের শিকার হন।)
তবে বিআরটিএ এক বিজ্ঞপ্তিতে গত বছর অক্টোবরে জানায় যে, অ্যাপে রাইড শেয়ারিং না করে চুক্তিভিত্তিক যাত্রী পরিবহন করলে সংশ্লিষ্ট চালক ও যাত্রীর বিরুদ্ধে আইনানুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এতে বলা হয়, রাইড শেয়ারিং সেবার নীতিমালা অনুযায়ী নির্দিষ্ট ভাড়ার বেশি নিলে রাইড শেয়ারিং প্রতিষ্ঠান ও চালকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে বিআরটিএ।
এতে আরও বলা হয়েছিল, ‘কতিপয় মোটরযান চালক নীতিমালার শর্ত পালন করছেন না। শর্ত পালন না করে চুক্তিভিত্তিক রাইড শেয়ারিং সেবা প্রদান ও অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে, যা রাইড শেয়ারিং সার্ভিস নীতিমালার পরিপন্থি।’
কিন্তু বিআরটিএর নীতিমালা কিংবা এসব বিজ্ঞপ্তি গুরুত্বই পায়নি অ্যাপভিত্তিক রাইড শেয়ারিং প্রতিষ্ঠান ও চালকদের কাছে। ফলে এখন ঢাকার মোড়ে মোড়ে চোখে পড়ে যাত্রীর জন্য অপেক্ষারত বাইক ও রাইডারদের সারি। যারা চুক্তিতে যাত্রী পরিবহন করে, যা এ-সংক্রান্ত নীতিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
যাত্রীদের যত অভিযোগ
রাইডশেয়ারিং সার্ভিস নিয়ে যাত্রীদের তরফ থেকে আসা অভিযোগগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
১. গন্তব্য শুনে অনুরোধ ক্যানসেল করে দেয়া।
২. চালকদের পছন্দনীয় গন্তব্য হলেই কেবল যাত্রী পরিবহন করা।
৩. বিকাশে বা কার্ডে টাকা নিতে অপারগতা প্রকাশ করা।
৪. যাত্রীকে অনুরোধ ক্যানসেল করতে বাধ্য করা, কিন্তু সেই ক্যানসেলের জন্য যাত্রীকেই জরিমানা করা।
৫. দরকষাকষি করে যাত্রা করা।
৬. অ্যাপে যেতে অপারগতা প্রকাশ করা।
৭. নারী যাত্রীদের সঙ্গে অশোভন আচরণ।
৮. সহজ পথে না গিয়ে গুগল ম্যাপের কথা বলে নানা জায়গায় ঘুরিয়ে গন্তব্যে পৌঁছানো।
এ বিষয়ে চালকদের বক্তব্য
এ বিষয়ে উবার চালক আলমের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, ‘অ্যাপে গেলে সার্ভিসদাতা প্রতিষ্ঠান ২৫ শতাংশ টাকা কেটে নেয়। এতে কস্ট অনুযায়ী লাভ থাকে না। তাই অ্যাপে যাই না।’
আরেক চালক শরিফুল শেখ বলেন, ‘জ্যামের কারণে অনেক জায়গায় যাই না। অ্যাপে গেলে লাভ কম। আর বিকাশে টাকা পেমেন্ট করার সুবিধা চালু করায় অনেকে বিকাশে টাকা দেন। কিন্তু বিকাশে টাকা দিলে সে টাকা যে কবে পাব তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তাই অ্যাপ ব্যবহার করি না।’
বাইক চালক হোসেন মিয়া বলছেন অন্য কথা, তিনি পড়াশোনা জানেন না। অনেক কষ্টে বন্ধুর সাহায্যে অ্যাপ খোলেন। কিন্তু তিনি অ্যাপের কিছুই বোঝেন না। এদিকে বাইক চালিয়েই তার সংসার চালাতে হয়। তাই তিনি অ্যাপ ব্যবহার করেন না। চুক্তি ভিত্তিতে যেতে পছন্দ করেন।
আরেক বাইকার রতন বলেন, ‘আমাদেরও তো নিরাপত্তার ব্যাপার আছে। তাই যে এলাকা চিনি না সেখানে যাই না।’
বিআরটিএ যা বলছে
বিআরটিএর পরিচালক শেখ মোহাম্মদ মাহবুব-ই-রব্বানী বলেন, ‘কেউ সুনির্দিষ্ট অভিযোগ করলেই কেবল আমরা ব্যবস্থা নিতে পারি। তবে আমরা যাত্রীদের হেনস্তার শিকার হওয়ার ঘটনা, প্রতিনিয়ত বেড়ে যাওয়ায় সার্ভিস দেয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে প্রায়ই মতবিনিময় করে থাকি। তাদের যথাযথ সেবা প্রদান করে এসব সমস্যার সমাধান করতে বলি।’
উবার যা বলছে
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উবারের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘যাত্রীদের দীর্ঘ অপেক্ষা এবং ট্রিপ বাতিলের বিষয়টি যাত্রীদের কাছে দেয়া আমাদের যে অঙ্গীকার তাকে ক্ষুণ্ন করেছে এবং আমরা এসব বিষয়ে কাজ করছি। ইতোমধ্যে আমরা কোথায় যাবেন প্রশ্নের সমাধানে; ড্রাইভার পার্টনার আপনার রাইড রিকোয়েস্ট একসেপ্ট করার আগেই দেখতে পাবেন ডেস্টিনেশন আর পেমেন্ট মোড চালু করেছি। তাই আর হতে হবে না নানাবিধ প্রশ্নের সম্মুখীন। আমরা অ্যাপের বাইরে (চুক্তিভিত্তিক) যাত্রী পরিবহনকে নিরুৎসাহিত করি। কারণ, এতে চালক ও যাত্রীর জবাবদিহি ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা থাকে না।’
তবে ভাড়া বেশি আসার বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
