বাণিজ্য ডেস্ক :
জলবায়ুর দিক থেকে ভৌগলিকভাবে বাংলাদেশ একটি দুর্যোগপ্রবণ দেশ। জলবায়ু সমস্যা মোকাবিলায় নেয়া নানা কার্যক্রমের মধ্যে ‘গ্রিন ব্যাংকিং’ অন্যতম; যা বর্তমানে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে আমূল পরিবর্তন এনেছে।
গ্রিন ব্যাংকিং মূলত এক ধরনের পরিবেশবান্ধব ব্যাংকিং কার্যক্রম, যেখানে পরিবেশের যাতে কোনোভাবে ক্ষতি না হয় সেদিকে সর্বোচ্চ নজর দেয়া হয়। প্রথম শিল্প বিপ্লবের পর থেকে পরিবেশকে উপেক্ষা করে যেভাবে শিল্পায়ন হয়েছে, তার ফল বর্তমানে ভোগ করছে সারা বিশ্ব। খুব ভালোভাবেই টের পাওয়া যাচ্ছে, পরিবেশ নিয়ে হেলাফেলা করলে সমগ্র মানবজাতির জীবনধারা সংকটের মুখে পড়বে। এ জন্য নানা ধরনের নেয়া উদ্যোগের মধ্যে বনায়ন অন্যতম। কিন্তু যে হারে কাগজের চাহিদা বাড়ছে এবং কাগজের যোগান দিতে গিয়ে গাছ কাটা হচ্ছে- তাতে করে এ বনায়ন কার্যক্রম ও প্রাকৃতিক বনগুলো পড়ছে ঝুঁকির মুখে।
গাছ বাঁচাতে এবং পরিবেশের ক্ষতি প্রশমনে একবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই কাগজবিহীন অফিসিয়াল কার্যক্রমটি বেশ সাড়া ফেলে। এরই সূত্র ধরে ২০০৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় গ্রিন ব্যাংকিং কার্যক্রম। ২০০৯ সালে মার্কিন কংগ্রেসে গ্রিন ব্যাংকিং ধারণাটি আইনগত সমর্থন লাভ করে। ২০১১ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক বাংলাদেশে সর্বপ্রথম গ্রিন ব্যাংকিং নীতিমালা তৈরি করে। পরবর্তীতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুসারে ২০১৩ সালে দেশের সব তফসিলি ব্যাংক নিজস্ব গ্রিন ব্যাংকিং নীতি এবং গ্রিন ব্যাংকিং ইউনিট তৈরি করে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
প্রায় দশ বছর হতে চলল গ্রিন ব্যাংকিংয়ের সঙ্গে রয়েছে বাংলাদেশ। মূলত দুটি মূল উদ্দেশ্য সামনে রেখে চলছে গ্রিন ব্যাংকি কার্যক্রম। গ্রিন ব্যাংকিংয়ের প্রথম লক্ষ্য ব্যাংকিং কার্যক্রমের মাধ্যমে কোনোভাবে যেন পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব না পড়ে। এক্ষেত্রে কাগজবিহীন লেনদেন ও নথিপত্র পরিচালনা, কার্বন নিঃসরণ কমানো ও সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বৃদ্ধিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে ব্যাংকিংয়ের বাইরে ‘গ্রিন ফিন্যান্সিং’ এর মাধ্যমে দেশের জলবায়ু ঝুঁকি সামলাতে অর্থায়ন ও নিজেদের প্রস্তুত করা গ্রিন ব্যাংকিংয়ের আরেকটি লক্ষ্য।
বাংলাদেশ ব্যাংকের দেয়া তথ্য থেকে দেখা যায়, চলতি বছরের মার্চ মাস অবধি দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ৩ হাজার ৮১৩টি শাখার মধ্যে ৮৩টি শাখার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে। এ ছাড়া এসব ব্যাংকের ৩৭০টি এটিএম বুথের মধ্যে সৌরশক্তি নির্ভর বুথ মাত্র ৪টি। গ্রিন ব্যাংকিং এ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর থেকে প্রাইভেট ব্যাংকের অবস্থা কিছুটা সন্তোষজনক। দেশের প্রাইভেট ব্যাংকগুলোর ৫ হাজার ৬০৮টি শাখার মধ্যে ৬১২টি শাখার কারগরি কার্যক্রমে সৌরবিদ্যুত ব্যবহার করা হচ্ছে।
এ ছাড়া এসব ব্যাংকের ৯ হাজার ৫৮৬টি এটিএম বুথের মধ্যে ২০৬টি বুথ সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। দেশের সামগ্রিক হিসাব থেকে দেখা যায়, ১১ হাজার ২২টি ব্যাংকের শাখার মধ্যে সৌরবিদ্যুতে চালিত ৭০২টি ও ১০ হাজার ১৮১টি এটিএম বুথের মধ্যে ২১৪টি বুথ সৌরবিদ্যুতশক্তি ব্যবহার করে পরিচালিত হচ্ছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার এত কম কেন জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম সময় সংবাদকে বলেন, দেশের ব্যাংকের শাখাগুলোকে সৌরবিদ্যুতের আওতায় আনতে গেলে এককালীন অর্থের প্রয়োজন। এটা অনেক বড় একটি প্রজেক্ট। তবে শুরুতে বড় অঙ্কের টাকা লাগলেও পরবর্তীতে এখান থেকে ভালো লাভ পাওয়া যায়। তবে আমাদের অনেক ব্যাংকের শাখা এমন কিছু জায়গায় আছে যেখানে আমরা ৫-১০ বছরের জন্য চুক্তিবদ্ধ। সেক্ষেত্রে কারিগরি প্রতিবন্ধকতা থাকায় এ মূহূর্তেই এগুলোকে সৌরবিদ্যুতের আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে না। তবে দেশের প্রতিটি ব্যাংকের শাখাকে সৌরবিদ্যুতের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে আমাদের। ব্যাংকগুলোও এ ব্যাপারে আগ্রহী।
বিভিন্ন প্রাইভেট ব্যাংকের এটিএম বুথ স্থাপনে কারিগরি সহযোগিতা দিয়ে থাকে বিভিন্ন টেক প্রতিষ্ঠান। এমনই এক প্রতিষ্ঠান ট্রাক্স টেকনোলজিসের ব্যবস্থাপক (বিজনেস ডেভেলপমেন্ট) মোস্তাহাদ আহমেদ সময় সংবাদকে বলেন, আমরা মূলত গ্রিন ব্যাংকিং নিয়ে আলাদাভাবে কাজ করছি। এটিএম জ্যাকেট আমাদের একটি উদ্ভাবন বলতে পারেন। এটি ব্যবহারে একটি বুথ চালাতে বিদ্যুৎ খরচ কমে আসে, কমে আসে বড় রকমের জায়গার ব্যবহার। ব্যাংকখাতকে কীভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির আওতাভুক্ত করা যায় এ নিয়ে কাজ করছি আমরা। কিছু কারিগরি প্রতিবন্ধকতা থাকলেও অদূর ভবিষ্যতে এখান থেকে লাভবান হওয়া সম্ভব বলে মনে করছি।
সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে বাংলাদেশের ব্যাকগুলো পিছিয়ে থাকলেও এগিয়ে গেছে অনলাইন ব্যাংকিং কার্যক্রম। এতে করে ব্যাংকে না গিয়ে কোনো ধরনের কাগজের ব্যবহার না করে, নিজের হাতের মুঠোয় থাকা মুঠোফোন দিয়ে চলছে লেনদেন, টাকা ট্রান্সফার, ই-স্টেটমেন্ট আদায় থেকে শুরু করে আনুষঙ্গিক অনেক কাজ। দিনকে দিন ইন্টারনেট ব্যাংকিং এ বাড়ছে গ্রাহক সংখ্যা।
মূলত দেশের তরুণ সমাজের কাছে ইন্টারনেট ব্যাংকিং দিনকে দিন জনপ্রিয়তা লাভ করছে। এ ছাড়া স্মার্টফোনের ব্যবহার বৃদ্ধি, ব্যাংকিং অ্যাপগুলোর কার্যক্রম সাবলীল হওয়া, নানা ধরনের বিল পরিশোধ ও টাকা ট্রান্সফারের সুবিধা পাওয়ার ফলে কাগজবিহীন এ ব্যাংকিং সেবাকে ইতোমধ্যে সফল বলা যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশে ইন্টারনেট ব্যাংকিং সুবিধা নেয়া গ্রাহকের সংখ্যা ছিল ২১ লাখ ৬৯ হাজার, ২০১৯-২০ অর্থবছরে এসে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২৭ লাখ ৪২ হাজারে, ২০২০-২১ এ গ্রাহক সংখ্যা হয় ৩৬ লাখ ৩৮ হাজার, সর্বশেষ অর্থবছরে ইন্টারনেট ব্যাংকিং ব্যবহারকারীদের সংখ্যা ছিল ৫৩ লাখ ৫৫ হাজার- যা একটি মাইলফলক। গত অর্থবছরে ইন্টারনেট ব্যাংকিং এর মাধ্যমে লেনদেন হয় ২ লাখ ২৪ হাজার ৯৫৮ কোটি টাকা, যা ২০২০-২১ অর্থবছরের তুলনায় ১২২ দশমিক ৬০ শতাংশ বেশি।
দ্য কনজারভেশনের তথ্য মতে, কেবল কাগজ তৈরির জন্য সারা বিশ্বে প্রতিদিন ১ লাখেরও বেশি গাছ কাটা হয়। ১ টন কাগজ তৈরিতে গড়ে ২৪টি গাছের প্রয়োজন হয়। যেভাবে দিনকে দিন প্রতিষ্ঠানের পরিমাণ বাড়ছে, এতে করে কাগজের চাহিদা মেটাতে এ হারে গাছ কাটতে থাকলে পৃথিবীর অনেকাংশ বিরান ভূমিতে পরিণত হবে, যা সামগ্রিক পরিবেশের জন্য আশঙ্কাজনক। এ ক্ষেত্রে কাগজবিহীন কাজের সংস্কৃতি তৈরিতে গ্রিন ব্যাংকিংকে একটি বৈপ্লবিক পদক্ষেপ বলছেন সংশ্লিষ্ট পরিবেশবিদরা।
