বাণিজ্য ডেস্ক :
চালের বাজারে চলছে দোষ চাপিয়ে দায়মুক্তির খেলা। আর এ খেলাতেই হুহু করে বাড়ছে দাম। এর কারণ হিসেবে মিলাররা যেসব যুক্তি দিচ্ছেন, হিসাব কষে তা মানতে নারাজ ঢাকার পাইকাররা। অথচ যুক্তি যেমনই হোক, দিনশেষে এসব চাপ বহন করতে হচ্ছে ক্রেতাদের। এ মুহূর্তে ধানের দাম বৃদ্ধির কোনো যৌক্তিকতা নেই দাবি করে বাজার অস্থির করার দায়ে মিল পর্যায়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির তাগিদ অর্থনীতিবিদদের।
‘দফায় দফায় ধানের দাম বাড়ার পাশাপাশি জ্বালানি তেলের দাম বাড়া এবং পরিবহন ভাড়া বাড়ায় চালের দাম বেড়েছে’–চালের দাম বাড়ার কারণ হিসেবে এ কথাই বলেন কুষ্টিয়ার এক চালকল মালিক। তার এ বক্তব্য ধরেই চলুন বের করা যাক কতটা অযৌক্তিকভাবে বাড়ছে চালের দাম।
চালের দাম বাড়ার দুই কারণ হচ্ছে জ্বালানি তেল ও ধানের দাম বৃদ্ধি। হিসাব শুরুর আগে জানা যাক, ডিজেলের দাম বৃদ্ধির পর নওগাঁসহ উত্তরবঙ্গ থেকে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে আসা ট্রাকের ভাড়া কত টাকা বেড়েছে।
এ বিষয়ে এক ব্যবসায়ী বলেন, আগে গাড়ি ভাড়া ১২ হাজার ৫০০ থেকে ১৪ হাজার টাকা ছিল। এখন তা বেড়ে ১৭ থেকে ১৮ হাজার টাকা হয়েছে।
পণ্য পরিবহনে যে ট্রাকের ভাড়া সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা বেড়েছে, সেই ট্রাকে ১৪ হাজার কেজি চাল আসে। সহজ হিসাব, পরিবহনের কারণে দাম বাড়বে কেজিতে ৩৬ পয়সা। কিন্তু বাস্তবতা কি আসলে তাই?
এ প্রসঙ্গে এক চাল ব্যবসায়ী বলেন, গাড়ি ভাড়া যদি হিসাব করা হয়, তাহলে প্রতি কেজি চালে ৫০ পয়সা বাড়বে। তবে মিলাররা ৫০ কেজির এক বস্তা চালের দাম ৩০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়িয়ে দিয়েছেন।
এদিকে দাম বাড়ার দায় বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর চাপিয়ে আরেক ব্যবসায়ী বলেন, ‘আমাদের মতো যারা ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী, তারা কোনো কারসাজি করতে পারেন বলে আমি মনে করি না। কিন্তু বৃহৎ আকারে যারা ব্যবসা করেন তাদের বিষয়টি ভিন্ন।’
ধানের দাম বৃদ্ধিতে কত বাড়তে পারে চালের দাম?
এর জবাবে নঁওগার এক ব্যবসায়ী বলেন, চিকন ধানের বাজার গেল ১০ থেকে ১২ দিনে মণপ্রতি ১০০ টাকা বেড়েছে।
ধানের দাম বৃদ্ধি আমলে নিলে এক মাসে চালের দাম কেজিতে আড়াই টাকা বাড়ার কথা। তাদের হিসাবেই সব মিলিয়ে চালের দাম সাড়ে তিন টাকার বেশি বাড়ার কথা নয়। অথচ বাজারবাস্তবতা, এক মাসে চালের দাম বেড়েছে কেজিতে ৮ থেকে ১০ টাকা।
এদিকে দিনশেষে বাড়তি দামের চাপ বইতে হচ্ছে ক্রেতাদেরই। তারা বলেন, আমাদের মতো মধ্যবিত্ত যারা আছেন, তারা তো রীতিমতো বাজারে আসতে ভয় পান। কারণ, জিনিসপত্রের এত দাম। এ ছাড়া যে কারণেই নিত্যপণ্যের দাম বাড়ুক না কেন, দিনশেষে আমাদেরই ভোগান্তি পোহাতে হয়।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এ মুহূর্তে ধানের দাম বৃদ্ধির কোনো কারণ নেই। তাই শুধু পরিবহন খরচ বৃদ্ধির প্রভাব পড়ার কথা বাজারে।
অর্থনীতিবিদ ড. মাহফুজ কবীর বলেন, উৎপাদন পর্যায়ে ও মাঠ পর্যায়ে ডিজেলের যে প্রভাব পড়েছে, তা কিন্তু মিলার পর্যায়ে পড়ার কথা নয়। সেই সঙ্গে সে প্রভাব পুরো বাজারে পড়ার কথা নয়। বাজারে শুধু পরিবহন খরচ বাড়ার প্রভাব পড়ার কথা। এর মূল কারণ সিন্ডিকেশন। আমার মনে হয়, মিলাররা ছাড়া এ বাজার অন্য কেউ তেমন নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাব বিস্তার করতে পারে না।’
দাম বাড়ার সব প্রভাব আমলে নিয়ে প্রতিটি নিত্যপণ্যের ক্ষেত্রেই হিসাব কষে দাম বাড়ানোর যৌক্তিকতা বের করে সরকারকে ব্যবস্থা নেয়ার তাগিদ ভোক্তাদের।
