বাণিজ্য ডেস্ক :
ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক দিক থেকে রাশিয়াকে অনেকটা একঘরে করে রাখার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও তার ইউরোপীয় মিত্ররা। কিন্তু এ পরিস্থিতিতে মস্কোর সহায়ক হিসেবে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে চীন।
যদিও ইউক্রেন যুদ্ধ ঘিরে নিজেকে অনেকটা নিরপেক্ষ অবস্থানে দেখানোর চেষ্টা করছে বেইজিং। ইউক্রেন সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধানের ডাক দিয়েছে তারা। তবে একই সঙ্গে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযানের নিন্দাও জানায়নি বেইজিং। উল্টো রাশিয়ার ওপর আরোপিত পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার সমালোচনা করেছে তারা।
বাড়ছে অর্থনৈতিক সহযোগিতা
এতদিন ধরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে রাশিয়ার সবচেয়ে বেশি বাণিজ্য হয়ে এলেও পরিস্থিতি পাল্টে দিয়েছে ইউক্রেন যুদ্ধ। ইউক্রেনে সেনা অভিযানের পর পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় এখন দিনদিন বাড়ছে চীন ও রাশিয়ার বাণিজ্য।
পাশাপাশি রাশিয়া থেকে তেল ও গ্যাস আমদানি বন্ধের পশ্চিমা হুমকির জবাবে চীনকে মনে করা হচ্ছে রাশিয়ার সবচেয়ে বিশ্বস্ত বিকল্প হিসেবে।
ইদানীং চীন ও রাশিয়ার মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য বেড়েছে অনেক বেশি। রাশিয়ার সামগ্রিক বাণিজ্যের ১৮ শতাংশ হয় চীনের সঙ্গে। ২০২১ সালে এর পরিমাণ ছিল ১৪৭ বিলিয়ন ডলার। আগের বছরের থেকে এ বছর মস্কো-বেইজিং বাণিজ্য বেড়েছে ২৮ শতাংশ। ২০২৪ সালের মধ্যে এই পরিমাণকে ২৫০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার কথা জানিয়েছে দুই দেশ।
গত ফেব্রুয়ারিতে বেইজিংয়ে শীতকালীন অলিম্পিকের সময় বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য বাড়ানোর বিষয়ে একমত হন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। পাশাপাশি রাশিয়ার তেল ও গ্যাস খাতে ১১৭ বিলিয়ন ডলারের চীনা বিনিয়োগেরও চুক্তি করেন দুই নেতা।
যদিও এখনো ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতেই যায় রাশিয়ার তেল ও গ্যাস রফতানির সিংহভাগ। কিন্তু চীনে রাশিয়ার জ্বালানি রফতানি বাড়ছে পাল্লা দিয়ে। দেশটিতে প্রতিবছর ৯ শতাংশ করে বৃদ্ধি পাচ্ছে রাশিয়ার তেল ও গ্যাস রফতানি।
বর্তমানে ‘পাওয়ার অব সাইবেরিয়া-২’ নামের নতুন একটি গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণ করছে দুই দেশ। ২০১৯ সাল থেকে একই নামের আরও একটি পাইপলাইনের মাধ্যমে রাশিয়া থেকে জ্বালানি সরবরাহ করছে চীন।
ঘনিষ্ঠ হচ্ছে রাশিয়া-চীন সামরিক সম্পর্ক
গত ফেব্রুয়ারিতে বেইজিংয়ের শীতকালীন অলিম্পিক থেকে ফিরেই ইউক্রেনে অভিযানের নির্দেশ দেন পুতিন। এ পরিস্থিতিতে কথা উঠেছে ইউক্রেন যুদ্ধে চীনের সমর্থন পেতেই বেইজিং গিয়েছিলেন পুতিন। সেখান থেকে সবুজ সংকেতও পান তিনি।
পাশাপাশি ইউক্রেন যুদ্ধে চীনের কাছ থেকে রাশিয়া সামরিক সহায়তা চেয়েছে বলে দাবি করে যুক্তরাষ্ট্র। তবে বেইজিং ও মস্কো এ তথ্যকে মিথ্যা বলে উড়িয়ে দেয়।
যদিও ঐতিহাসিকভাবে সমরাস্ত্রের জন্য রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীল চীন। কিন্তু দিনদিন প্রযুক্তিগতভাবে উন্নতি করায় ড্রোনের মতো সামরিক প্রযুক্তিতে রাশিয়ার চেয়ে চীন অনেক বেশি এগিয়ে। মস্কোও বেইজিংয়ের ড্রোন প্রযুক্তির ব্যাপারে অনেক বেশি আগ্রহী।
পাশাপাশি রাশিয়ার প্রচলিত সমরাস্ত্রের অন্যতম আমদানিকারক চীন। ২০১৭ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত চীনের অস্ত্র আমদানির ৮০ ভাগই হয়েছে রাশিয়া থেকে। ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে দুই দেশের সামরিক সহযোগিতা আরও জোরদার হচ্ছে।
আর্থিক খাতে মস্কোর লাইফলাইন বেইজিং
ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার বেশিরভাগ গুরুত্বপূর্ণ ব্যাংককে সুইফট ইন্টারন্যাশনাল পেমেন্ট সিস্টেম থেকে বের করে দেয়ায় বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন হয়ে পড়ে মস্কোর জন্য। আর এ ক্ষেত্রে এখন বেইজিংয়ের সহযোগিতা বড় প্রয়োজন তাদের। সুইফট থেকে রাশিয়ার ব্যাংকগুলো বাদ পড়লেও বিকল্প পদ্ধতিতে রাশিয়ার সাথে আর্থিক কার্যক্রম চালাচ্ছে চীনা কোম্পানিগুলো।
রাশিয়ার রয়েছে নিজস্ব আর্থিক পদ্ধতি সিস্টেম ফর ট্রান্সফার অব ফিনান্সিয়াল মেসেজেস বা এসটিএফএম। অপরদিকে চীনের রয়েছে ক্রস বর্ডার ইন্টারব্যাংক পেমেন্ট সিস্টেম (সিআইপিএস)। এ দুই পদ্ধতিই পরিচালিত হয় তাদের নিজস্ব মুদ্রায়।
সুইফট থেকে রাশিয়া বাদ পড়ায় বর্তমানে চীনের সঙ্গে ইউয়ানে লেনদেন বাড়িয়েছে মস্কো। আগে দুই দেশের মধ্যে মাত্র ১৭ শতাংশ লেনদেন ইউয়ানে হলেও ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর এ হার বেড়েই চলেছে। বিশেষ করে মার্চ থেকে রাশিয়া থেকে ইউয়ান ব্যবহার করে জ্বালানি কিনছে চীনের পেট্রো কেমিক্যাল কোম্পানিগুলো।
রাশিয়ার খাদ্যপণ্যের বিকল্প বাজার এখন চীন
রাশিয়া বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম খাদ্য উৎপাদন ও রফতানিকারক দেশ। পক্ষান্তরে চীন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ খাদ্য আমদানিকারক দেশ। ইউক্রেন যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে দুই দেশের মধ্যে খাদ্য খাতেও সম্পর্ক প্রসারিত হচ্ছে ব্যাপকভাবে।
এতদিন রাশিয়া থেকে গম ও বার্লি আমদানিতে চীনে কিছু বিধিনিষেধ থাকলেও ইউক্রেন রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরুর পরপরই তা তুলে নেয় চীন।
সূত্র: রয়টার্স, বিবিসি, সিএনএন
