বাণিজ্য ডেস্ক :
জ্বালানি তেলের রেকর্ড পরিমাণ দাম বাড়ায় আবারও নতুন করে আলোচনায় এসেছে আইএমএফের ঋণ প্রসঙ্গ। সংশ্লিষ্ট অনেকেই বলছেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্ত মানতে গিয়ে বাড়ানো হয়েছে জ্বালানি তেলের দাম। তবে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছেন, দাম বৃদ্ধির সঙ্গে আইএমএফের শর্তের কোনো সম্পর্ক নেই। সম্পর্ক থাক বা না থাক, আইএমএফ থেকে ঋণ নেয়ার আগে একটি দেশের বেশ কিছু বিষয়ে আগে থেকেই সতর্ক অবস্থানে থাকা উচিত।
আইএমএফ মূলত একটি দেশের স্বল্পমেয়াদি অর্থনৈতিক উন্নয়ন কিংবা পুনরুদ্ধারে ঋণ দিয়ে থাকে। বাংলাদেশ এর আগে আইএমএফ থেকে চারবার ঋণ নিলেও এবার যে ঋণের আবেদন করেছে, তা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। আইএমএফ মূলত কয়েকটি শর্তের ওপর ভিত্তি করে ঋণ দিয়ে থাকে। সব দেশের জন্য শর্ত এক বিধায় ফলাফল সবসময় এক হয় না। বিশেষ করে আইএমএফের শর্ত মানতে গিয়ে অনেক স্বল্পোন্নত দেশ ও উন্নয়নশীল দেশের বিপদে পড়ার রেকর্ড রয়েছে।
ঋণ দেয়ার আগে আইএমএফ প্রধানত সুদহার বৃদ্ধি ও ভর্তুকি প্রত্যাহারের ওপর শর্তারোপ করে থাকে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল একটি দেশে এই দুটি খাত অনেক বেশি স্পর্শকাতর। কোনো ধরনের সমঝোতায় না গিয়ে এ ধরনের শর্ত মেনে নিলে বিপদে পড়তে পারে বাংলাদেশ–এমনটাই ভাবছেন বিশেষজ্ঞরা।
জ্বালানিখাতে ভর্তুকি কমানো
এর আগে কখনোই এক লাফে জ্বালানি তেলের দাম এতটা বাড়েনি। এবারের অকস্মাৎ মূল্যবৃদ্ধিতে বাজারে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। জ্বালানি খাতের ভর্তুকি তলানিতে নিয়ে এলে কেবল যানবাহনে নয়, প্রভাব পড়বে দেশীয় উৎপাদনের প্রতিটি খাতে।
আইএমএফ মূলত ‘গ্রিন এনার্জি’ অর্থাৎ পরিবেশখাতকে গুরুত্ব দিয়ে জ্বালানি তেলে ভর্তুকিতে নিরুৎসাহিত করে। এ ক্ষেত্রে আইএমএফের যুক্তি, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে মানুষ কম তেল কিনবে। এতে কম তেল পুড়বে, দূষণও হবে কম। জ্বালানি তেলের দাম কম হওয়ায় মানুষ গ্রিন এনার্জির দিকে ঝুঁকবে।
কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে চিন্তা করলে দেখা যায়, এখানে জ্বালানির বিকল্প তেমন কিছুই নেই। অর্থাৎ, কৃষকের কাছে কিংবা পরিবহন খাতের হাতে যখন ডিজেলের বিকল্প তুলে না দিয়ে উল্টো ডিজেলের দাম বাড়িয়ে দেয়া হয়, তখন বাধ্য হয়ে বেশি দামেই ডিজেল কিনতে হবে সংশ্লিষ্টদের। ডিজেলের বাড়তি দাম পোষাতে বাড়বে আমদানি খরচ ও পরিবহন ব্যয়। এ ছাড়াও বাড়বে কারখানার উৎপাদন খরচ। ব্যবসায়ীরা লাভ করতে বাড়াবেন পণ্যের দাম। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে সাধারণ ক্রেতাদের ওপর। এতে বেড়ে যাবে মূল্যস্ফীতি। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ালে এমন কোনো পণ্য নেই, যার দাম বাড়বে না।
জ্বালানি তেলসহ অন্যান্য খাতে আইএমএফের ভর্তুকি কমানোর আরেকটি যুক্তি হচ্ছে, ভর্তুকি কমালে সরকারের অর্থ অপচয় কমবে। মূলত সরকার জনগণের ওপর আরোপিত কর থেকে এ ভর্তুকির জোগান দিয়ে থাকে। ভর্তুকির পাশাপাশি কর কমালে দেশের জনগণের ওপর চাপ কমবে বলে মনে করে আইএমএফ। কিন্তু বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে যারা আয়কর দিয়ে থাকেন, তাদের কমবেশি সামর্থ্যবান বলেই ধরা হয়। এ ছাড়া কাঁচাবাজার কিংবা খোলাবাজারে মূল্য সংযোজন কর থেকে শুরু করে অন্যান্য কর কতটুকু কমানো হবে কিংবা আদৌ কমানো হবে কি না, কমালেও ভোক্তা পর্যায়ে তার প্রভাব কতটুকু পড়বে, তা নিয়ে সন্দিহান হওয়া স্বাভাবিক।
কেননা, বাংলাদেশের বাজার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাজারে দাম বাড়লে রাতারাতি তার প্রভাব পড়ে, কিন্তু দাম কমলে তার প্রভাব পড়তে লেগে যায় কয়েক মাস। যখন কমতি দামের প্রভাব পড়তে যাবে, তখন বেশির ভাগ সময় আবার বেড়ে যায় দাম। এতে সাধারণ ক্রেতারা এই দুষ্টচক্রে সবসময় ভুক্তভোগী হন।
ব্যাংক সুদহার বাড়ানো
আইএমএফের ঋণ দেয়ার আরেকটি বড় শর্ত ব্যাংক সুদহার বাড়ানো। বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, ঋণের ক্ষেত্রে সুদহার সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ ও আমানতের ক্ষেত্রে ৬ শতাংশ। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, সুদহার বাড়ানো নিয়ে তারা আপাতত নতুন কোনো সিদ্ধান্ত নিচ্ছে না। কিন্তু জ্বালানির মতো করে আকস্মিক সুদহার বেড়ে গেলে দেশের ব্যবসাখাতে বিরূপ প্রভাব পড়বে–এ কথা বলা বাহুল্য।
এ ক্ষেত্রে আইএমএফের যুক্তি হচ্ছে, ব্যাংক বেশি টাকা পাবে, জনগণ কম ঋণ নেবে। ঋণ কম নেয়ায় খরচ কম করবে সাধারণ মানুষ। এতে বাজারে কমে যাবে চাহিদা, চাহিদার বিপরীতে জোগান কমে এলে পণ্যের দাম কমে আসবে। ফলে বাজারে মূল্যস্ফীতি হ্রাস পাবে। অর্থনীতির ভাষায় এটিকে বলা হয় নেতিবাচকভাবে অর্থনীতিকে শ্লথ করে দিয়ে বাজার সামলানো, যা উন্নয়নশীল একটি দেশের জন্য বিপজ্জনক।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে রয়েছেন অসংখ্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী, যাদের বিনিয়োগের মূল পুঁজির জোগান আসে ব্যাংক ঋণ থেকে। এ ক্ষেত্রে সুদহার বেড়ে গেলে ব্যবসায়ীরা ঋণের টাকা মেটাতে হিমশিম খাবেন, ক্ষতিগ্রস্ত হবে ব্যবসাখাত। অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী ব্যবসা করতে গিয়ে বাজারে টিকে থাকতে পারবেন না। এতে বেড়ে যাবে বেকারত্বের হার, কর্মহীন হয়ে পড়বে অনেক মানুষ, বাজারে বাড়বে একচেটিয়া মুনাফালোভী কোম্পানি, জনগণ হয়ে পড়বে জিম্মি।
সুদহার বাড়ানোর আগে বাজার সমন্বয় করা জরুরি, যেমনটা জরুরি ছিল জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর আগে। একটি উন্নত দেশ যেসব কাঠামোর মাধ্যমে নিজের অর্থনীতিকে সামাল দেয়, অনেক ক্ষেত্রে স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের জন্য একই কাঠামো ‘বুমেরাং’ হয়ে দাঁড়ায়।
আইএমএফের শর্ত মেনে বিপদে পড়েছিল যেসব দেশ
১৯৭০ সালে আরব বিশ্বের দেয়া তেল নিষেধাজ্ঞায় সবচেয়ে বেশি অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল আফ্রিকা মহাদেশ। সে সময় আফ্রিকার দেশগুলোতে রফতানি আয়ের বিপরীতে আমদানি ব্যয় বেড়ে যায় বহুগুণ। দেশের বাজার মূল্যস্ফীতি দাঁড়ায় আকাশচুম্বী। অর্থনীতিতে সাম্যাবস্থা ফিরিয়ে আনতে সে সময় আফ্রিকার দেশগুলো আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক থেকে অযৌক্তিক সব শর্ত মেনে, কোনো ধরনের বিচার-বিশ্লেষণ না করে ঋণ গ্রহণ করে। ১০ বছরের মধ্যে আইএমএফের ঋণের বিরূপ প্রভাব পড়তে থাকে আফ্রিকার দেশগুলোর ওপর। সমস্যা কমার চয়ে বরং বেড়ে যায়, দেশীয় বাজার হয়ে ওঠে অস্থিতিশীল। ১৯৮০-৯০ এই ১০ বছরকে আফ্রিকায় বলা হয় ‘লস্ট ডিকেড’ অর্থাৎ হারিয়ে যাওয়া ১০টি বছর।
আইএমএফের শর্ত মেনে আফ্রিকার সরকার তাদের বিপুলসংখ্যক প্রতিষ্ঠানকে বেসরকারি সংস্থার হাতে ছেড়ে দেয়। এতে বাজারে সৃষ্টি হয় ‘মনোপলি’ (একচেটিয়া ব্যবসা)। অন্যদিকে আইএমএফের আরেক শর্ত ছিল বাজারকে বাজারের মতো চলতে দেয়া (মার্কেট লিবারেলাইজিং)। এটি মানতে গিয়ে বাজারে দেখা দেয় মারাত্মক মূল্যস্ফীতি। পরবর্তী সময়ে মূল্যস্ফীতি প্রকট আকার ধারণ করলেও সরকার আইএমএফের কথা মেনে সুদহার বাড়িয়ে দিলে দেশে দেশে দেখা দেয় অর্থনৈতিক মন্দা।
অর্থনীতির পাশাপাশি মানবিক অধিকার লঙ্ঘনেও পরোক্ষভাবে সমর্থন দেয় আইএমএফ। আফ্রিকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালি দেশ আইভোরি কোস্ট কোকো রফতানিতে শীর্ষস্থানে ছিল। বিশ্বের ৪৩ শতাংশ কোকো রফতানি হতো আইভোরি কোস্ট থেকে। কোকো কোম্পানিগুলোকে প্রাইভেটাইজেশন (বেসরকারিকরণ) করা হলে, কোম্পানিগুলো নামমাত্র মজুরিতে শিশু শ্রমিকদের কাজ করতে বাধ্য করে। এতে যেখানে সংকটের সময় ১৯৮৮ সালে আইভোরি কোস্টের দারিদ্র্যের হার ছিল ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ, ঋণের শর্ত মানতে গিয়ে ১৯৯৫ সালে সে হার বেড়ে দাঁড়ায় ৩৭ শতাংশে। দেশটিতে রফতানি বাড়লেও কমে যায় জিডিপি ও সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা। (সূত্র: লেবার রাইট)
আফ্রিকার আরেক দেশ সেনেগাল প্রথমবারের মতো আইএমএফ থেকে ঋণ নেয় ১৯৮৪ সালে। আইএমএফের শর্ত অনুযায়ী দেশটির প্রধান একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানকে বেসরকারিকরণ করা হলে এক ধাক্কায় কাজ হারায় ৫ হাজার মানুষ। সে সময় দেশটিতে ৪০ শতাংশ ভর্তুকি কমিয়ে দিলে বেড়ে যায় প্রায় প্রতিটি পণ্যের দাম। একদিকে দেশ সামাল দেয়া, অন্যদিকে বিদেশি ঋণ পরিশোধ করা। এমন অবস্থায় ২০০০ সালের সেনেগালের অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, দেশটির জিডিপির ৭১ দশমিক ৩ শতাংশই হচ্ছে বৈদেশিক ঋণ। আইএমএফ থেকে ১৯৮৪ সালে ঋণ নেয়ার পরও ২০০০ সালে এসে সেনেগালকে ‘চরম দেনাগ্রস্ত গরিব দেশ’ (এইচআইপিসি) তকমা নিতে বাধ্য হতে হয়। বলা হয়ে থাকে, আইএমএফের শর্ত মানতে গিয়ে সর্বস্ব হারিয়েছে সেনেগাল। (সূত্র: আইবিআইডি)
আফ্রিকার স্বাবলম্বী দেশ হিসেবে ধরা হয় জিম্বাবুয়েকে। আশির দশকে যখন আফ্রিকার অন্যান্য দেশ টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছিল, সে সময় জিম্বাবুয়ে বেশ দাপটের সঙ্গেই টিকে ছিল। সংকটের সময়ও সঠিক সময়ে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করে নিজেদের অর্থনৈতিক সক্ষমতার জানান দিয়েছিল জিম্বাবুয়ে। সে সময় দেশটির প্রতিটি সামাজিক সুরক্ষা খাতে সরকারের ভর্তুকি ও সেবাদানে সাধারণ ভোক্তাদের মধ্যে স্বস্তি বিরাজ করছিল। কিন্তু নিজেদের কাঠামোগত উন্নয়নের জন্য আইএমএফ থেকে ১৯৯১ সালে ৪৮৪ মিলিয়ন ডলার ঋণ নেয়া কাল হয়ে দাঁড়াল দেশটির জন্য। আইএমএফের চিরাচারিত শর্ত মানতে গিয়ে এক বছরের মাথায় জিম্বাবুয়ের জিডিপি কমল ৮ শতাংশ। এ ছাড়া ভর্তুকি কমাতে গিয়ে প্রাইমারি শিক্ষায় বাজেট কমল ৩৬ শতাংশ ও মাধ্যমিকে কমল ২৫ শতাংশ। এ ছাড়াও সরকারি এ খাতে শিক্ষকদের বেতন কমল ৪৩ শতাংশ পর্যন্ত, যা একটি দেশের ভবিষ্যৎ নাগরিকদের গড়ে তোলার জন্য শঙ্কাজনক। অন্যদিকে আইএমএফের শর্তানুযায়ী, দেশটির সরকার স্বাস্থ্যখাতে ভর্তুকি কমিয়ে দিলে দেশে বেড়ে যায় এইচআইভির প্রকোপ। একসময়ের সমৃদ্ধশালী জিম্বাবুয়ের সুখী নাগরিকদের জীবন হয়ে ওঠে বিপর্যস্ত। (সূত্র: জেডএসবি)
এবারের প্রথম এত বড় অঙ্কের ঋণ নিচ্ছে বাংলাদেশ। কেবল বাংলাদেশ নয়, চলতি বছর আইএমএফ থেকে ঋণ পাচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ পাকিস্তান ও আফ্রিকার দেশ ঘানা ও তানজানিয়া। বর্তমানে বাংলাদেশের রিজার্ভ ৪০ বিলিয়ন ডলারের কমবেশি। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এমন কোনো ঝুঁকিতে নেই, যেখানে আইএমএফ আলোচনার টেবিলে যে শর্ত রাখবে তা-ই বিনা বাক্যে মেনে নিতে হবে। কদিন আগেও বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার দেশ হিসেবে দ্রুততম অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দেশ ছিল। ভারতের থেকেও বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ছিল প্রশংসাজনক। কিন্তু কোনো ধরনের পর্যালোচনা না করে হুটহাট আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত দেশের বাজার তথা সামগ্রিক অর্থনীতিকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে–এটা বিবেচনায় রাখা উচিত নীতিনির্ধারকদের। ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা মানুষ ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় না, এটা বাংলাদেশের বেলায় সত্যি হয়ে গেলে সমূহ সম্ভাবনার দেশের দৃশ্যচিত্র বদলে যেতে পারে অচিরেই–এমনটা মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। পরিসংখ্যান ও অতীত ইতিহাস থেকে দেখা যায়, দর্শনগত জায়গা থেকে আইএমএফের ঋণে সুবিধার চেয়ে ঝুঁকিই বেশি।
