বাণিজ্য ডেস্ক:
এক বছরে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ‘বিজনেস ডিপ্লোমেসি’ পুরো আন্তর্জাতিক মেরুকরণ পরিবর্তন করে দিয়েছে। ব্যবসায়িক সুবিধা পাওয়া চীন-রাশিয়ার পাশাপাশি জাপান-সিঙ্গাপুর-সৌদি আরব এবং আরব আমিরাত দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনের পর বর্তমান সরকারের পাশে দাঁড়িয়েছে। বাদ যায়নি ইউরোপের ফ্রান্স ও ডেনমার্কের মতো দেশও। আর ব্যবসায়িক দেনা-পাওনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে চট্টগ্রাম বন্দর।
বিদেশি রাষ্ট্রদূত থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তারা একের পর এক সাক্ষাতের মাধ্যমে চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ায় আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানিয়ে যাচ্ছেন। সবশেষ ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূতও প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। অথচ শুরু থেকে এই দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে কম জটিলতা সৃষ্টি হয়নি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এসব বিদেশি দূতাবাস ও সংস্থার প্রধানদের আওয়ামী লীগের কাছাকাছি আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে সাম্প্রতিক সময়ের বিজনেস ডিপ্লোমেসি।
ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরামের চেয়ারম্যান এস এম আবু তৈয়ব সাংবাদিকদেরকে বলেন, জাতীয় নির্বাচনের পর বিভিন্ন দেশ স্থিতিশীলতার আভাস পাওয়ার কারণে আমাদের প্রতি তাদের আকর্ষণটা বাড়ছে। তারা এখন চাচ্ছে যে বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করে নিজেদের সুবিধা আদায় করবে।
বিশেষ করে গত ৬ মাসের মধ্যেই শুধু চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে ব্যবসার কাজে সম্পৃক্ত হয়েছে জাপান-সিঙ্গাপুর-ডেনমার্ক-সৌদি আরব ও আরব আমিরাত। এর মধ্যে মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দরে যেমন জাপান রয়েছে, তেমনি বঙ্গোপসাগর হয়ে কর্ণফুলীর মোহনার মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে জেটি ও কনটেইনার ইয়ার্ডের কাজ করবে ডেনমার্ক ও সৌদি আরব। আর বে টার্মিনালে অন্তত ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ প্রস্তাব নিয়ে এসেছে সিঙ্গাপুর ও আরব আমিরাত।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম সোহায়েল বলেন, গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলো বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তি করছে, বিনিয়োগ করছে। এটা আমাদের দেশকে আন্তর্জাতিকভাবে একটা শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যাবে।
অবশ্য চট্টগ্রাম বন্দরের পাশাপাশি রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সরকারের বেশ কটি মেগা প্রকল্পের সঙ্গে জড়িয়েছে ফ্রান্স, রাশিয়া, চীনসহ উন্নত দেশগুলো। ঢাকায় মেট্রোরেলের অংশীদার জাপান একই সঙ্গে শাহজালাল বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল পরিচালনারও দায়িত্ব পেতে যাচ্ছে। ঈশ্বরদীর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে রাশিয়ার বিনিয়োগ। আর ফ্রান্স থেকে বাংলাদেশ এয়ারবাস কিনবে তা-ও অনেকটা নিশ্চিত। প্রথমটির মতো দ্বিতীয় বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট হবে ফ্রান্সের হাত দিয়ে। এ ছাড়া চট্টগ্রামের বঙ্গবন্ধু টানেলসহ পাশেই চীনের চায়না সিটি।
রাশিয়ার কনসাল জেনারেল স্থপতি আশিক ইমরান বলেন, এটা আওয়ামী লীগ সরকারের কূটনৈতিক সফলতা। একই সঙ্গে অনেক দেশকে বাংলাদেশের উন্নয়নে শরিক হওয়ার যে একটা পদ্ধতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা করেছেন, তার ফল আমরা দেখতে পেয়েছি নির্বাচনের পর।
দেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলছে চট্টগ্রাম বন্দর। কারণ, এই বন্দর দিয়েই বছরে অন্তত ৪ লাখ কোটি টাকার পণ্য যেমন আমদানি-রফতানি হচ্ছে, তেমনি রাজস্ব আদায় হচ্ছে ৬০ হাজার কোটি টাকার বেশি। এ ক্ষেত্রে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে চট্টগ্রাম বন্দরকেন্দ্রিক বিজনেস ডিপ্লোমেসির কোনো বিকল্প দেখছেন না বন্দর চেয়ারম্যান।
রিয়ার অ্যাডমিরাল এম সোহায়েল বলেন, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলো এরই মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে সরাসরি বিনিয়োগের মাধ্যমে কাজ করা শুরু করে দিয়েছে। এটা আমাদের দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।
বে টার্মিনাল দিয়ে শুরু হয়েছিল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের বিজনেস ডিপ্লোমেসি মিশন। এরপর একে একে যুক্ত হয়েছে মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর, পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল, পতেঙ্গার লালদিয়ার চর। এখানেই শেষ নয়, বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালসহ আরও বেশ কিছু স্থাপনা এখনও বাকি রয়ে গেছে, যেখানে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশসহ ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশ।