জাতীয় ডেস্ক:
গেল দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ না পেয়ে মন্ত্রীদের সঙ্গে দেখা করে ভোট নিয়ে ভিন্নমত আছে বলে মন্তব্য করে যাচ্ছেন ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাস। কিন্তু বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ দেশটি। এদিকে নির্বাচনের সময় ভোট নয়, সহিংসতা পর্যবেক্ষণের জন্য টিম পাঠিয়েছিলো তারা। সেই দলও দিতে পারেনি বড় ধরনের ব্যত্যয়ের তথ্য। এখন কি তবে নিজেদের মুখ রক্ষার জন্য ভিন্ন মতের কথা বলছে তারা?
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমের কয়েকটি দেশের নানা রকম অযাচিত কর্মকাণ্ড এবং দৌড়ঝাঁপের মধ্যে গেল ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নিরঙ্কুশ বিজয় নিয়ে টানা চতুর্থবারের মতো শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠন করে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।
নির্বাচনে বিজয়ের পর বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্র প্রধানরা অভিনন্দন জানান শেখ হাসিনাকে। ঢাকায় থাকা বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও মিশন প্রধানরাও সশরীরে গণভবনে গিয়ে অভিনন্দিত করেন আওয়ামী লীগ সভাপতিকে।
কিন্তু চুপ ছিল কেবল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। তবে রোববার শেখ হাসিনাকে চিঠি লেখেন দেশটির প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। চিঠিতে বাইডেন বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে পাশে থাকবে যুক্তরাষ্ট্র। উন্মুক্ত ইন্দো প্যাসিফিক অঞ্চল গড়ে তুলতে যৌথভাবে কাজ করারও প্রতিশ্রুতি দেন বাইডেন।
এছাড়া আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, জ্বালানি ও বৈশ্বিক বিষয়ে একত্রে কাজ করার আশা প্রকাশ করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। কিন্তু চিঠিতে নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয় কিংবা নতুন সরকার গঠন নিয়ে কোনো বার্তা ছিল না।
বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে গেল বছরখানেক ধরেই নাওয়া-খাওয়া ভুলে দৌড়ঝাঁপের মধ্যে ছিলেন পিটার হাস। কখনো রাজনৈতিক দল ও নেতাদের দুয়ারে ধর্না দিয়েছিলেন তিনি। আবার বিএনপি জামায়াত ও জাতীয় পার্টির নেতারা আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিকভাবে দফায় দফায় বসেছেন তার সঙ্গে।
সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচনের ধুয়া তুলে নানা সবক দেয়ার চেষ্টা করেছেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত। কিন্তু গেল বছরের ২৮ অক্টোবর ঢাকায় মহাসমাবেশের নামে বিএনপি জামায়াতের নজিরবিহীন তাণ্ডবের পর নীরব হয়ে যান পিটার হাস।
তবে মন্ত্রিসভার শপথের পরদিনই তিনি দেখা করেন তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে। এরপর ধারাবাহিকভাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী, আইনমন্ত্রীসহ বিভিন্ন মন্ত্রীদের সঙ্গে দেখা করে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে কথা বলে আসছেন পিটার হাস। সবশেষ রোববার (৪ জানুয়ারি) সচিবালয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরীর সঙ্গে দেখা করেন তিনি।
নির্বাচন নিয়ে কী কথা হয়েছে জানতে চাইলে সাংবাদিকদের পরিবেশমন্ত্রী জানান, ‘‘পিটার হাস বলেছেন, ‘তারা মনে করেন, বাংলাদেশের নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ হয়নি। তারপরও তারা সম্পর্ক এগিয়ে নিতে চান।’’
এদিকে পিটার হাসও সব মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেই গণমাধ্যমে একটি কথা বলে আসছেন – নির্বাচন নিয়ে ভিন্নমত আছে তাদের। কিন্তু বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক মজবুত করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ তারা।
বিশ্লেষকদের মতে, একসঙ্গে কাজ করা তাদের মূল উদ্দেশ্য নয়, পিটার হাস আসলে মন্ত্রীদের সঙ্গে সাক্ষাৎকে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ করার অপকৌশল হিসেবে বেছে নিয়েছেন।
তাদের মতে, নির্বাচনের পর থেকে পিটার হাসের মন্তব্য এবং বাইডেনের চিঠির ভাষা প্রমাণ করে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের স্বার্থে বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী হলেও ৭ জানুয়ারির ভোট নিয়ে দেশে-বিদেশে এক অস্বস্তি তৈরি করতে চায় দেশটি। কারণ যুক্তরাষ্ট্র খুব করে চেয়েছিল বাংলাদেশে তাদের পছন্দের সুশীলদের নিয়ে একটি অনির্বাচিত সরকার আনতে।
সংসদে মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাস
২০০৬–২০০৭ সালে ঢাকার সে সময়ের মার্কিন রাষ্ট্রদূত হ্যারিকে টমাস ও প্যাট্রিসিয়া বিউটেনিস অনির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠায় সফল হলেও, এবারে ব্যর্থ হয়েছেন পিটার হাস ও বাইডেন প্রশাসন। আবার এবারে বিএনপি না এলেও নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার বড় কোনো সুযোগও পাচ্ছে না যুক্তরাষ্ট্র। সুতরাং নির্বাচন নিয়ে ইনিয়ে বিনিয়ে কথা বলে, একদিকে বাংলাদেশকে অস্বস্তিতে ফেলার পাঁয়তারা তাদের। আরেকদিকে নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকার জন্য ভোট নিয়ে ভিন্নমত আছে বলে মন্তব্য করছে।
এই প্রেক্ষাপটে পর্যবেক্ষকরা এও বলছেন, প্রয়োজনে সরকারের মন্ত্রীদের উচিত হবে পিটার হাস তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেও নির্বাচন নেতিবাচক মন্তব্য করতে তাকে বিরত রাখা।
নিজেরটা ষোল আনা বোঝে মার্কিনিরা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদের মতে, নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্যে ভূ-রাজনীতির প্রভাব রয়েছে।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী বক্তব্য এক দিকে, কিন্তু তাদের অর্থনৈতিক বিষয়টা আরেক দিকে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র এই নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তুললেও অনেক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র রয়েছে, যারা এই নির্বাচনকে সাধুবাদ জানিয়েছে। নির্বাচনের পরপরই তারা সরকারকে অভিনন্দন জানিয়েছে।
এই অধ্যাপক বলেন, নির্বাচনের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি বক্তব্য ছিল যে এটি সুষ্ঠু হয়নি। কিন্তু একই সঙ্গে তারা বলেছে যে- সরকারের সাথে কাজ চালিয়ে যাবে। এখন দেখার বিষয়, সরকার যেসব দেশের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য করা শুরু করবে, সেখানে আমেরিকা কতখানি ঢুকতে পারে। কারণ, আমেরিকার ঢোকাটা একটু কঠিন হবে।
অধ্যাপক ইমতিয়াজ মার্কিনিদের এমন আচরণের বিষয়ে বলেন, এ দেশে গণতন্ত্র কিংবা মানবাধিকার বাস্তবায়ন করতে আসেননি পিটার হাস। তিনি নিজ দেশের স্বার্থই দেখছেন। নির্বাচনের আগে পিটার হাস যেসব কথা বলেছিলেন, তাও নিজ দেশের স্বার্থ রক্ষার জন্যই বলেছেন। মূলত তাদের জাতীয় স্বার্থই এখানে আসল।
যুক্তরাষ্ট্র আসলে তাদের নিজের স্বার্থ হাসিলে আগ্রহী উল্লেখ করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) সরকার ও রাজনীতির বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ইখতিয়ার উদ্দিন ভূইয়া বলেন, স্বার্থের জন্য যুক্তরাষ্ট্র আজকে এক দিক দিয়ে ভালো সম্পর্ক রাখবে, কালকে হয়তো অন্য দিক দিয়ে চাপ দিবে।
‘বাংলাদেশে আজকে তারা বিভিন্ন বিষয় নিয়ে চাপ প্রয়োগ করেছে। যেমন, শ্রম অধিকার ও মানবাধিকার নিয়ে’, যোগ করেন তিনি।
জাবির এই শিক্ষক বলেন, চাপ প্রয়োগ ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। তারা এই অঞ্চলে চীনের আধিপত্য কমাতে চায় এবং এটা কমানোর জন্য তারা এসব ইস্যু সামনে নিয়ে আসে।
রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়, এমন কর্মকাণ্ড কাম্য না
বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনের বেশ আগে থেকেই সক্রিয় ছিলেন পিটার হাস।বাংলাদেশি গণমাধ্যমের ওপর ভিসানীতি আরোপের হুমকি দিয়েও বিতর্ক উসকে দিয়েছিলেন এই রাষ্ট্রদূত। নির্বাচনের সময় এবং পরবর্তী কিছুদিন নীরব থাকলেও নতুন করে আবার বিতর্কিত বক্তব্য দিচ্ছেন তিনি। তার এই ধরনের বক্তব্য রাজনৈতিক সহিংসতাকেই উসকে দেবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
পিটার হাসের বক্তব্য ভিয়েনা কনভেনশনের লঙ্ঘনের পর্যায়ে পড়ে উল্লেখ করে বিশিষ্ট সাংবাদিক ও গবেষক অজয় দাশগুপ্ত বলেন,
তিনি (পিটার হাস) বলছেন- একসঙ্গে কাজ করতে চান। এটা খুব ভালো। যুক্তরাষ্ট্র যে ধরনের একটা অবস্থান নিয়েছিল নির্বাচনকে কেন্দ্র করে, বিএনপিও তাতে উৎসাহিত হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের সেই অবস্থানের ওপর ভরসা করেই সহিংস রাজনৈতিক কর্মসূচি দিয়েছিল বিএনপি। এখন তারা যদি আবার আগের মতো বক্তব্য দেন তাহলে রাজনৈতিক সহিংসতাকেই উসকে দেয়া হবে।
বিতর্ক সৃষ্টি হয় এমন কর্মকাণ্ড থেকে মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে বিরত থাকার পরামর্শ দিয়ে অজয় দাশগুপ্ত বলেন, ‘আমরা আশা করবো- দ্বিচারিতা না করে, ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে কথা না বলে স্পষ্ট করে বলা উচিত। যে কোনো দেশের সার্বভৌমত্বের মর্যাদা তিনি মেনে চলবেন এবং কূটনৈতিক শিষ্টাচার অনুসরণ করবেন।’ এমন বার্তা তাকে স্পষ্ট করে দেয়া উচিত বলে মনে করেন এই সিনিয়র সাংবাদিক।